১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লের কারণ ও ফলাফল Best Online Education
১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লব
১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লের কারণ ও ফলাফল Best Online Education এই আর্টিকেলটিতে ১৯০৫ সালে বিপ্লবের কারণ এবং ব্যর্থতার কারণগুলি সুপরিকল্পিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লবের কারণ :
বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে সামন্ততন্ত্রের অন্তরালে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকের উদারনৈতিক ভাবধারার সংক্রমণ বাঁচিয়ে রাশিয়া চলছিল। কিন্তু নানা উপাদানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ঝঞ্ঝাক্ষন্ধ হয়ে ওঠে—সংঘটিত হয় ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লব। এই উপাদানগগুলিকে রাজনৈতিক, অর্থ নৈতিক ও সামাজিক প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত করা যায় ।
রাজনৈতিক কারণ :
রাজনৈতিক : তিন শতাব্দী ধরে রাশিয়ার কেন্দ্রীভূত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। দৈবম্বত্বে বিশ্বাসী জার ছিলেন প্রচলিত রাজনৈতিক “ সমাজস্বৈল্পশাসন ব্যবস্থার মধ্যমণি। জারতন্ত্র পরিচালিত হত সৈন্যবাহিনী, পালিস বাহিনী, ভ,স্বামী অভিজাত শ্রেণী, আমলা ও চার্চের মাধ্যমে। জনপ্রতিনিধিম,লক কোন সংস্থা ছিল না। গ্রামগুলিতে মীরগালির কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না।
এই রকম শাসন ব্যবস্থায় প্রয়োজন ছিল দক্ষ শাসকের ৷ কিন্তু জার দ্বিতীয় নিকোলাস আদৌ দক্ষ শাসক ছিলেন না। তিনি দেশপ্রেমিক হলেও, দুর্বলচিত্ত এই শাসক রাজত্বের প্রথমদিকে প্রতিক্রিয়াশীল পোবিডোনোস্টেভ ও স্বৈরাচারী প্লেভের প্রভাবাধীন ছিলেন। রানী আলেকজান্ড্রার বশীভূত হয়ে তিনি বধিজীবী ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের সাংবিধানিক সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বানচাল করে দেন ।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, কারাদণ্ড, নির্বাসনদণ্ড এবং বিস্তারিত গপ্তেচর ব্যবস্থার পুনগঠন তাঁর শাসনরীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া তিনি জার্মান, ইহুদী, ফিন, পোল ইত্যাদি অংশ জাতীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেতে নির্মমভাবে রুশীকরণ নীতি অবলম্বন করেন ।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অসন্তোষ
জারতন্ত্রের এই ঘোর প্রতিক্রিয়াশীলতায় রুশ জনগণের ক্ষোভ পূঞ্জিভূত হতে থাকে। ভূমিদাসের মক্তির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ভূস্বামীরা আশা করেছিল তাদের ত্যাগের বিনিময়ে তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার পাবে ৷ কৃষকরা মীরের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বৈধ স্বীকৃতি না পাওয়ায় ক্ষুধ ছিল । আবার রাশিয়ায় ইউরোপীয় উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভাবধারার অনঃপ্রবেশ রোধ করা রুশ স্বৈরাচারী শাসকদের শতচেষ্টাতেও সম্ভব হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে রুশ বু দ্ধিজীবীরা গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু করে ।
রুশ শাসকরা দননমলেক নীতি অবলম্বন করে। রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ ছিল। এইভাবে নিয়মতান্ত্রিক পথে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনার অধিকার না থাকায় বহু গ.প্ত রাজনৈতিক সমিতি গড়ে উঠতে থাকে ।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল
১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে মার্ক‘সবাদী এই দলটি 'বলশেভিক (সংখ্যাগরিষ্ঠ) ও 'মেনশেভিক' (সংখ্যালঘ ) নামে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। বলশেভিকরা লেনিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নেতৃত্বে বিপ্লবের মাধ্যমে রুশ সমাজের আমলে পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিল। অন্যদিকে নেনশেভিকদের কম সচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল— প্রথমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং তারপর সামাজিক পরিবর্তন সাধন ।
উল্লেখযোগ্য দল সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারী দলের রাষ্ট্রায়ত্ত করে সামাজিক নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত করা ৷ মতবাদ বিস্তারে মনোযোগী ছিল। তারা দলের সন্ত্রাসবাদকে গ্রহণ করে। উদারনৈতিক জমিদার ও বুর্জোয়ারা গঠন করে 'লিগ অব, এমানসিপেশান' (১৯০৩ খ্রীঃ)। শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র সংস্থাপনই ছিল এর মলে লক্ষ্য । পোল্যান্ড, ইউক্রেন, ল্যাটভিয়া, এস্টোনিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে সমাজতন্ত্রী দল প্রভাব বিস্তারে সামর্থ হয়।
১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে লেনিনের চেষ্টায় প্রকাশিত হয় ‘ইসক্রা' (ফলিঙ্গ ) নামে পত্রিকা। পত্রিকাটি রুশ জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা জাগ্রত করতে প্রভুত সাহায্য করেছিল । ছাত্র-শিক্ষক-কৃষকদের নানা বিচ্ছিন্ন অভ্যুত্থান ঘটতে থাকে। এগুলি সমস্তই অবশ্য দমিত হয়ে যায় । এই রাজনৈতিক চেতনার মালে অর্থনৈতিক সঙ্কটের ভূমিকাও নগণ্য ছিল না।
অর্থনৈতিক কারণ :
অর্থনৈতিক ঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে রাশিয়ায় দ্রুত শিল্পায়ন ঘটলেও তার মলে ছিল বিদেশী মালধনের সাহায্য । ফলে জাতীয় ঋণও বৃদ্ধি পেতে থাকে । হিসেব করে দেখা গেছে ১৮৯৪-১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্য ন্ত রুশ সরকারের বিদেশী লগ্নীকারকদের সন্দে হিসেবে বার্ষিক দেয় ছিল চল্লিশ কোটি রবল । ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে রাশিয়ার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল চার শ কোটি রুবল। রাশিয়ার প্রজাশক্তির সিংহভাগ কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল চরম শোচনীয়।
দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ভ,মিদাসদের মহূক্তি দিলেও, প্রাক্তন ভূস্বামীদের তুলনায় ‘মীর’গলি কম অত্যাচারী ছিল না। তারা ‘মীর’ ছেড়ে যেতে পারত না বা ইচ্ছামত জমিজায়গা বিক্রি করতে পারত না ৷ শিল্পে-নিযক্ত শ্রমিকদের অবস্থা সমভাবেই শোচনীয় ছিল । শিল্পবিপ্লবের আদিপর্বে উদ্ভূত সমস্ত কুফল নিয়ে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে । সে-কারণে ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের রুশ বিপ্লবের পর্বের বৎসরগ, লিতে ঘন ঘন কৃষক বিদ্রোহ ও শিল্পে ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হতে থাকে ৷ ১৮৯৯ থেকে ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাশিয়ায় শিল্পক্ষেত্রে মন্দা দেখা দেয়।
বহু , কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা চরম দুর্দশার সম্মুখীন হয় । এই অর্থনৈতিক মন্দার বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে না পেতেই দূরপ্রাচ্যে রাশিয়া জাপানের সঙ্গে যদ্ধে লিপ্ত হয়। যদ্ধের প্রয়োজনে সংরক্ষিত সৈন্য সংগৃহীত হয় গ্রামাঞ্চল থেকে । ফলে কৃষিজ উৎপাদন ব্যহত হয় ও শিল্পে কর্ম সংস্থানের সংযোগ হ্রাস পায়। রাজনৈতিক দলগলে কৃষক/শ্রমিকদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে ।
সামাজিক কারণ :
সামাজিক : রাশিয়ার সমাজ ছিল দ্বিধাবিভক্ত, একদিকে অভিজাত সম্প্রদায়- অন্যদিকে কৃষক/শ্রমিক সম্প্রদায়, যারা ছিল জনসংখ্যার সিংহভাগ। রাজনৈতিক দিক থেকে ভুমিদাস প্রথা উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কৃষকদের দঃখ দুর্দশার অন্ত ছিল না। রাশিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠেনি তখনও।
তাই মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ব্যক্তি ও বিপুল সংখ্যক জনগণের মধ্যে ছিল দস্তর ব্যবধান। মুষ্টিমেয় শিক্ষিতজনের মধ্যে কিছ, সংখ্যক জেমস্টভোগগুলির মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য দাবি প্রবল হয়ে ওঠে। এরা গণসংযোগ স্থাপনের জন্য সচেষ্ট হয় । এর ফলে আমলাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয় । র ুশ যাজকরা ছিল অভিজাত শ্ৰেণীভুক্ত । তারা অর্থ লোল,পতা ও পাপাচারের জন্য জনগণের শ্রদ্ধা হারিয়েছিল।
প্রত্যক্ষ কারণ ঃ
রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪-০৫) রাশিয়ার ধারাবাহিক বিপথ য় ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের রুশ বিপ্লব ত্বরান্বিত করেছিল। যুদ্ধের আরম্ভ থেকেই জনগণ এটিকে রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থ বিরোধী হিসেবে গণ্য করেছিল। জাতীয় অবমাননায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ অভ্যুত্থান ঘটায় । নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পথে সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি কেবলমাত্র শিক্ষিতজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। সাধারণ মানুষও এই দাবিগুলিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে ।
বিপ্লবের গতি : রুশ শাসনব্যবস্থার উন্নতি সাধনের উদ্দেশ্যে সরকারী নির্দেশে ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে সমস্ত জেম,স্টভোর প্রতিনিধিরা সেন্ট পিটার্সবার্গে সমবেত হয়। মতানৈক্য সত্ত্বেও কতকগুলি সাধারণ দাবি উত্থাপিত হয়েছিল, যেমন —বিবেক, বাক, মদ্রণ, জনসভা ও সঙ্ঘ স্থাপনের স্বাধীনতা এবং ন্যায়-বিচার, স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসনে অধিকতর ক্ষমতা এবং শক্তিশালী পার্লামেন্ট গঠন। স্বৈরাচারী জার দ্বিতীয় নিকোলাস দাবিগুলিকে উপেক্ষা করলেন । এরপর রুশ-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ে গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করল ।
রক্তমাখ রবিবার
অবশেষে পঞ্জীভূত গণবিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটল ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে। সেন্ট পিটার্সবার্গের বহু কলকারখানার শ্রমিকরা ঐ সময় ধর্মঘট করে । ৯ই জানুয়ারী রবিবার গ্রেগরী গ্যাপন নামে জনৈক পাদ্রীর নেতৃত্বে প্রায় দেড় লক্ষ শ্রমিক তাদের দস্তখত্ সম্বলিত আবেদনপত্র জারের কাছে পেশ করার জন্য তাঁর শীতকালীন প্রাসাদের অভিম, খে শোভাযাত্রা করে অগ্রসর হয় ।
কেননা এদের অনেকেরই ধারণা ছিল তিনি সহৃদয় হলেও তাদের দরবস্থার কথা তাঁর অজানা । কিন্তু “জনগণের জনক” জার তাদের দর্শন না দিয়ে সেই প্রাসাদ ত্যাগ করে গেলেন। জারের সৈন্যবাহিনী শোভাযাত্রার পথরোধ করে তার ওপর গলিবর্ষণ করল । এক হাজারেরও অধিক শোভাযাত্রাকারী শ্রমিক নিহত হল, আহত হল আরও অনেক বেশি। ঘটনাটি ইতিহাসে 'রক্তমাখা রবিবার' ( Bloody Sunday ) নামে স্বরণীয় হয়ে আছে ।
প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটির তাঁর প্রতিক্রিয়া হল । সেন্ট পিটার্সবার্গে সাধারণ ধর্মঘট দেখা দিল এবং তা দ্রুত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল। শত্রু হল কৃষি হাঙ্গামা। কৃষকরা বহ, অভিজাতদের আবাসস্থলে অগ্নিসংযোগ করে। মে মাসে ইভানোভো-ভজনেসন, কস্-এর কাপড়ের কলের ধর্মঘটী শ্রমিকরা একটি সোভিয়েট বা বিশেষ কাউন্সিল নির্বাচিত করে ধর্মঘটের নেতৃত্ব দান করে।
এর সূত্র ধরে রাশিয়ায় বিভিন্ন স্থানে সোভিয়েট গঠিত হতে থাকে— পরবর্তীকালে শ্রমিকদের প্রতিনিধিস্থানীয় এই সোভিয়েটগ, লি গরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী সংস্থায় পরিণত হয় । সৈন্যবাহিনীর মধ্যেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। জুন মাসে 'পোটেমকিন' নামক রণতরীর সৈনিকরা বিদ্রোহ করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রেরিত সৈনিকরাও উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের আদেশ সত্ত্বেও গালিবর্ষণে অসম্মত হয়। বিদ্রোহীদের হাতে জারের প্রতিক্রিয়াশীল খুল্লতাত গ্রান্ড ডিউক সারগাস নিহত হন ।
এই পরিস্থিতিতে ঘোর স্বৈরাচারী জার নরমপন্থা অবলম্বন করতে বাধ্য হলেন। ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের আগস্ট মাসে এক ঘোষণাপত্রে তিনি বলেন যে, তিনি ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কাউন্সিল বা ডুমা আহ্বান করবেন । কিন্তু এটির শধুমাত্র পরামর্শ দানের ক্ষমতা থাকায় এবং শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখায় এই ঘোষণা জনগণের সন্তোষ বিধান ঝরতে পারে নি। সুতরাং পর পর সংঘটিত কয়েকটি ধর্মঘটে রাশিয়ার জনজীবন স্তব্ধ হয়ে যায়।
এগুলির মধ্যে অক্টোবর মাসের সাধারণ ধর্মঘট ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য । রেলপথ, বিদ্যুৎ, কলকারখানা, চিকিৎসক ও আইনজীবী এমন কি স্থল ও নৌবাহিনী এই ধর্মঘটের এক্তিয়ারভুক্ত ছিল। এগুলির ওপর শুধুমাত্র দমন-উৎপীড়নের নীতির অসারতা জার নিকোলাসও বুঝতে পারলেন । সেজন্য ১৭ই অক্টোবর তারিখে এক ঘোষণাপত্রের দ্বারা সংস্কার ও সাংবিধানিক সরকারের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হলেন তিনি। কৃষকদের দাঙ্গা-হাঙ্গামার তীব্রতায় প্রধানমন্ত্রী উইটি শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য ভ,স্বামীদের সম্পত্তির অধিকার খর্ব করার চিন্তাও করেন ।
এদিকে ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বৈপ্লবিক কার্যকলাপ তুঙ্গে ওঠে। মস্কোর শ্রমিকরা বহ, শিল্প কেন্দ্রের ( যেমন রস্টভ-অন-ডন, সরমোভো ) শ্রমিকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটায়। জারের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ঘটে। বলশেভিক দল বিদ্রোহীদের নানাভাবে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু এই বিক্ষিপ্ত ও বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত অভ্যুত্থানগুলি একটি সংসংহত বিপ্লবের রূপ ধারণ করে নি।
সুপরিকল্পিত দমননীতির দ্বারা জার সরকার এগুলির কন্ঠরোধ করে। ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে হিসেব করে দেখা গেছে যে, জার সরকারের এই নৃশংস দমনউৎপীড়নে নিহত হয়েছিল পনের হাজার এবং কারার দ্ধ হয়েছিল সত্তর হাজার ব্যক্তি। এছাড়াও, অসংখ্য প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ( যেগগুলির মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত 'রাশিয়ান পিপলস, লিগ ) পলিস, প্রশাসন এমনকি সমাজবিরোধী ব্যক্তিদের সাহায্যে ‘প্রোগোম’ সংগঠিত করেছিল অর্থাৎ বিপ্লবীদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল।
১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যেই বিপ্লব ব্যর্থ' হয়ে যায়। অবশ্য জার ডুমা বা জাতীয় পরিষদ আহ্বান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর আহত চারটি ডুমার মধ্যে শেষ দুটি ছিল তাঁর একান্ত আজ্ঞাবহ । প্রথম দুটি ( ১৯০৬ ও ১৯০৭ খ্রীঃ) ডুমা বিপ্লবী দলগুলির মতবিরোধের জন্য ভেঙে দেওয়া হয়। বস্তুতঃ এর পরই রাশিয়ার প্রথম বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯০৭
১৯০৫ সালের বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ :
বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ :
রুশ সরকারের নিষ্ঠুর ও নির্বিচার দমননীতি ও প্রতিবিপ্লবীদের দ্বারা সংগঠিত 'প্রোগোম' অভিযানের জন্য ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম রুশ বিপ্লবের যবনিকাপাত ঘটে। কিন্তু এই বিপর্যায়ের মলে ছিল এই বিপ্লবের অন্তনিহিত দবলৈতা । প্রথমতঃ, এই বিপ্লবের নেতৃত্বে কোন সংগঠিত দল ছিল স্বৈরশাসনের প্রতি সকলেই সমভাবে বিদ্বিষ্ট ছিল, তাই এই স্বতঃস্ফূতের আন্দোলনটিকে আপাতদৃষ্টিতে প্রকৃত গণআন্দোলন বলে মনে হয়েছিল ।
কিন্তু এটি বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত ছিল এবং রাজনৈতিক দলগুলি একযোগে কাজ করলেও তাদের উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা অনেকক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী ছিল । নারোদনিকিরা সন্ত্রাসবাদী পন্থায় কৃষকদের জন্য জমি ছিনিয়ে নিতে আগ্রহী ছিল । সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা কৃষকদের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিল । বলশেভিকদের আকাঙ্ক্ষা ছিল গ্রামের মান ুষদের সমর্থন-লাভ ৷ কিন্তু তাদের সে আশা অপূর্ণ থেকে যায় ।
তাদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কর্ম‘সচে। প্রধানতঃ শিল্প-প্রধান শহরের উগ্রপন্থীদেরই আকৃষ্ট করেছিল । সরকারী শাসনব্যবস্থার বিপর্যায়ের সংযোগে মেনশেভিকরা ট্রেড ইউনিয়নগলি ও অন্যান্য অধিকারগুলি দখলের জন্য সচেষ্ট হয় ৷ উদারনৈতিকদের সংগঠন 'লিগ অব এমানসিপেশান' নতুনভাবে ‘কন্সস্টিটিউশন্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি” ( সংক্ষেপে 'ক্যাডেট' ) নামে আত্মপ্রকাশ করে। এর কর্মসূচী হয় সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংবিধান পরিষদ গঠন, সামাজিক সংস্কার ও জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি।
এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর উপায় হিসেবে হিংসাত্মক পদ্ধতির প্রতি তাদের ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা । তাই জার কর্তৃক আহত প্রথম ডুমা বা জাতীয় পরিষদে এদের সঙ্গে অক্টোবরিস্টদের মতপার্থক্য চরমে ওঠে। এর পরে দ্বিতীয় ডুমাতেও ক্যাডেট ( এরা ডুমাকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী ছিল ) এবং বামপন্থীদের ( এরা বৈপ্লবিক কর্ম সচীর পক্ষপাতী ছিল ) অনৈক্যের সংযোগে তা প্রধানমন্ত্রী স্টলিপিন ভেঙে দেন ।
কৃষক-শ্রমিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি:
বিতীয়তঃ, কৃষক-শ্রমিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি ৷ তাই আন্দোলন স সংহত হতে পারে मि একথা সত্যি, বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের দেয় ক্ষতিপূরণ অর্থ প্রদান বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিল জারকে । কিন্তু এই আন্দোলনগুলি ছিল বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত । ভ্যার জারের মহান ভবতায় তখনও কৃষকদের আস্থা ছিল । তারা মনে করেছিল জারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের অবস্থার পরিবর্তíন ঘটবে । তাদের এই মোহ তাদের রাজনৈতিক অসচেতনতারই সাক্ষ্য দেয়।
তৃতীয়তঃ, স্থলবাহিনী নৌবাহিনীর কিছ, কিছু অংশ বিদ্রোহে যোগদান করেছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা বিদ্রোহে তাংশ তাই জার এদের সাহায্যেই বিপ্লব দমন করেছেন। স্থল ও নৌবাহিনী সহযোগী নয় অক্ষরে রাখতে বৈদেশিক ঋণ নেয় নি।
চতুর্থতঃ, বিপ্লবের ফলে সন্ত্রস্ত বিদেশী পাঁজিপতিরা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাৰ্থৰ জারকে সর্বপ্রকার সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ফরাসী ব্যাঙ্কাররা তাঁকে পাঁচাশি লক্ষ ফ্রাঙ্ক ঋণ দিয়েছিল । এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, এটি হল মানবেতিহাসে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ঋণ। এই ঋণের ফলে জার জনসমর্থনবঞ্চিত হয়েও তাঁর স্বৈরশাসন পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন ৷
সংবিধানসম্মত শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা :
১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্তি সঞ্চর
জার সরকারের সংগঠিত দমননীতির কাছে রাশিয়ার প্রথম বিপ্লব আত্মসমর্পণ করে । সূচনাতেই এই বিপ্লব স্তিমিত হয়ে আসে। ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের বিপ্লবীদের মধ্যে ভাঙন স্পষ্টতর হতে থাকে, কন্সটিটিউশনাল ডেমোক্রাট বা ক্যাডেটরা পার্লামেন্টকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে চাইল, কিন্তু তাক্টোবরিস্টরা জারের ঘোষণাপত্রে ( অক্টোবর, ১৯০৫ খ্রীঃ ) আস্থাশীল থাকে।
সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের শিবিরে অন্তর্দলীয় দ্বন্দ্ব শহর হয়ে যায়, অন্যদিকে সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশনারীরা ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতিতে লিপ্ত থাকে । এ রকম পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতা শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে । অভিজাতভাস্বামী-চার্চ —-আমলাতন্ত্র-সৈন্যবাহিনী ইত্যাদি "ইউনিয়ন অব দি রাশিয়ান পিপল' নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে । এর উদ্দেশ্য ছিল অক্টোবর ঘোষণায় জার-প্রদত্ত উদারনৈতিক শাসনের প্রতিশ্রুতির পরিধি যাতে বিস্তৃত না হয় তার জন্য জারকে সাহায্য করা ।
তবু , ১৯০৫-এর বিপ্লবী বিস্ফোরণের প্রচ্ছায়ায় জার দ্বিতীয় অবশ্য প্রথম ভুমা বা জাতীয় সভা অক্টোবরের প্রতিশ্রুতি পালনে উদ্যোগী হলেন । আহ্বানের পর্বেই এর ক্ষমতা সঙ্কুচিত করার জন্য দুটি কার্য কর ব্যবস্থা তিনি অবলম্বন করলেন। একটি ঘোষণা জারি করে প্রধানতঃ সরকারী কর্মচারী সদস্য-বিশিষ্ট 'কাউন্সিল অব দি এম্পায়ার' নামে জাতীয় সভার ঊর্ধ্ব কক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়।
জার কর্তৃক ডুমার ক্ষমতা সকোচনের ব্যবস্থা কোন আইন ডুমা এবং কাউন্সিলে অননুমোদিত হওয়ার পর জারের অন,মোদনের জন্য তা প্রেরিত হবে। এছাড়া, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী উইটি ঘোষণা করেন যে, দেশের মৌলিক আইন পরিবর্তনের অধিকার ডুমার থাকবে না।
প্রথম ডুমা ( ১০ই মে থেকে ২২শে জুলাই ১৯০৬ )
১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই মে তারিখে ডুমার প্রথম অধিবেশন শুরু হল । এতে সর্ববৃহৎ দল ছিল ‘কন্সটিটিউশন্যাল ডেমোক্র্যাটরা। সামগ্রিকভাবে ডুমা পশ্চিমী উদারনৈতিক ধাঁচে রাশিয়ার আমলে সংস্কার চেয়েছিল। জারের সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ ‘কাউন্সিল অব দি এম্পায়ারের গঠনের পরিবর্তন দাবি করেছিল। এছাড়া সামরিক আইন উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রীয় জমিজমাগলির কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদী ইজারা দান তাদের অন্যতম দাবি ছিল।
সদস্যরা শাসনব্যবস্থার ত্রুটিগুলির নির্ভীকভাবে সমালোচনা করেন । কন্সটিটিউশন্যাল ডেমোক্র্যাটরা জাতীয় সভার কাছে দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা নীতি কার্যকর করার দাবি করলে জার তার প্রবল বিরোধিতা করেন। একটি সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা দেয় ৷ জার “জনগণের প্রতিনিধিরা নিজ অধিকার বহির্ভূত বিষয়ে বিপথগামী” হওয়ার অজুহাতে প্রথম ডুমা ভেঙে দিলেন ( ( ২২শে জুলাই, ১৯০৬ খ্রীঃ)।
১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই মার্চ— দ্বিতীয় ডুমার অধিবেশন আরম্ভ হবে ঘোষিত হয়। স্টলিপিন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। প্রথম ডুমার বহ, সদস্য ফিনল্যান্ডে আশ্রয় নেয় । তারা ভাইবর্গ' থেকে ২৩০ জন সদস্য-স্বাক্ষরিত একটি ঘোষণাপত্র জারি করে। এতে
প্রথম ডুমা ভেঙে দেওয়ার বিরদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। যোগদান না করতে জনগণকে আহ্বান জানান হয় ।কিন্তু এই 'ভাইবর্গ, ঘোষণাপত্র' জনগণের মধ্যে আশানরূপে সাড়া জাগাল না। রুশ সরকার ততদিনে বিপ্লবের ধাক্কা সামলে উঠেছে। সরকার নির্বাচনে কারচুপি করায় 'কন্সটিটিউশন্যাল ডেমোক্র্যাটদের’ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে হ্রাস পেল ।
নির্ধারিত দিনে দ্বিতীয় ডুমার অধিবেশন শুরু হল । সঙ্গে ডুমার বিরোধ শুর হয় । দ্বিতীয় ডুমা প্রথম থেকেই মন্ত্রিসভার অবশেষে রুশ সরকার বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য ষোলজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। সাংবিধানিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপে ডুমা উত্তাল হয়ে ওঠে। জার দ্বিতীয় ডুমা ভেঙে দিলেন ( ১৬ই জুন, ১৯০৭ খ্রীঃ)। এর পর প্রধানমন্ত্রী স্টলিপিন নির্বাচন আইন এমন ভাবে পরিবর্তিত করে দেন যে, কৃষক-শ্রমিকদের ভোটাধিকার সঙ্কুচিত হয়ে যায়, ডুমা পরিণত হয় উচ্চশ্রেণীর এক নির্বাচিত সংসদে ।
নব-নির্বাচিত তৃতীয় ডুমার অধিবেশন শুরু হল ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বরে ৷ জারের আজ্ঞাবহ প্রধানতঃ ভূস্বামীদের এই পরিষদ পাঁচ বৎসর স্থায়ী হয়েছিল । এর একমাত্র উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল মীরে’র ঘটিয়ে কৃষকদের জমির স্বত্ত্ব-স্বামিত্ব দান তৃতীয় ডুমা (১৯০৭ ১৯১২ ) কর্তৃত্বের অবসান (স্টীলপিন প্রতিক্রিয়া দ্রষ্টব্য ) ।
চতুর্থ ডুমা : চতুর্থ ডুমার নির্ব চিনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল প্রতিক্রিয়াশীলরাই। অবশ্য ‘অক্টোবরের ঘোষণা’ অনুযায়ী শাসনতন্ত্র রচিত হয় নি―এই অজ,হাতে অক্টোবরিস্টরা জার সরকারের বিরোধিতা শুরু করে । ক্রমে সংস্কার আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে । ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্দে 'প্রোগ্রেসিভ ব্লক' নামে এক সংস্কারবাদী দল গড়ে ওঠে। জারের স্বৈরশাসন-বিরোধী মনোবৃত্তি সমস্ত শ্রেণীর মধ্যে সংক্রামিত হয় ৷ এর অনিবার্ষ' পরিণতি হয় ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর বিপ্লবে । এর ফলে জারতন্ত্রের চিরতরে বিলুপ্তি ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম সাম্যবাদী সরকার ।
স্টীলপিন প্রতিক্রিয়া: দ্বিতীয় নিকোলাসের মন্ত্রীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্টীলপিন ১৯০৬ থেকে ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দ পর্য ন্ত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে বৃত ছিলেন ৷ অন্তরে রক্ষণশীল হলেও প্রয়োজনবোধে উদার নীতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে তিনি কুণ্ঠিত ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের পরই তিনি নির্বিচার দমননীতির সাহায্যে সন্ত্রাসবাদী ও বিপ্লববাদীদের স্তব্ধ করে দেন ।
১৯০৫ ও ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের শস্যহানি, ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে স্থানে স্যানে দদুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব কৃষকদের বৈপ্লবিক মনোভাবকে বর্ধিত করেছিল। ১৯০৫-০৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্য ন্ত বহু, কৃষক অভ্যুত্থান ঘটেছিল – সারা দেশে অগ্নিকাণ্ড, লঠতরাজ ইত্যাদির তাণ্ডব চলেছিল। অগণিত কৃষক ও বিপ্লবীদের রক্তস্নানে সরকার বিপ্লব দমন করে।
অন্ততঃ কিছ, সংখ্যক কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল—১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে গঠিত হয়েছিল 'কৃষক ইউনিয়ন' নামে একটি দল। প্রথম ডুমাতেই এক কৃষক প্রতিনিধি ভূস্বামীদের উদ্দেশ্যে বজ্রকণ্ঠে বলেছিল যে, তারা তাদের জমি চুরি করেছে। সতরাং তারা জমি ক্রয় করে নয়, ছিনিয়ে নেবে । প্রবল ভূমিক্ষধা নয়, তাদের সচেতনতারও সাক্ষ্য বহন করে।
মীরের নিয়ন্ত্রণ লোপ
স্টলিপিন তাই বুঝেছিলেন ভূমি সমস্যার সমাধান কত জরুরী। তাঁর দৃষ্টিতে কৃষকদের অসন্তোষের মহলে হল মরি বা গ্রাম্যসমিতিগলির কৃষক ও কৃষি উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ। সতরাং স্টলিপিনের আইন সংস্কারের প্রথম উদ্দেশ্য হল এই নিয়ন্ত্রণ বিলপ্ত করা। সমষ্টিগতভাবে কৃষকদের জমি ভোগদখলের পরিবর্তে কৃষকদের জমির ব্যক্তিগত মালিকানাত্ব দান । এ ব্যাপারে কৃষকদের ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত জমির মালিকানা না দিয়ে জমির চকবন্দীকরণ এবং তা বংশান ক্রমিক করার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল ।
স্টলিপিন সংস্কারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল কৃষকরা যাতে সহজে ভস্বামীর বা সরকারী জমি ক্রয় বা খাজনার পরিবর্তে ভোগদখলের অধিকার পায় তার ব্যবস্থা করা। এই অনসারে কৃষকদের জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাঙ্কগুলির কর্ম পদ্ধতির সংস্কার সাধন করা হল যাতে কৃষকদের ভূ-সম্পত্তিবৃদ্ধির সংযোগ তারা সহজে ঋণ পায় । গ্রাম্য ঋণদানকারী সমিতিও গড়ে তোলা হয় ।
স্টলিপিন সংস্কারের তৃতীয় উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের ভূমিক্ষুধা নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত ভ,মিষ,ক্ত অনাবাদী অঞ্চলে ( যেমন সাইবেরিয়া ) কৃষকদের বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করা। কৃষকদের গমনাগমনের ওপর মীরগগুলির পরোন নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করা হয় । করধার্য ও কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে মীরগালিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অনাবাদী অঞ্চলে কৃষকদের বসতিস্থাপন
স্টীলপিন সংস্কারের ফলে মধ্য গীয় কৃষি-উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তর্তন ঘটে। কৃষিযন্ত্র ও কৃত্রিম সার প্রয়োগ করা হতে থাকে। কিন্তু কৃষির এই উন্নতি কয়েকটি স্থানে এবং বড় বড় জোতদারের খামারে সীমাবদ্ধ ছিল । আর গয়ত্ব 'কুলাক’ যা বড় বড় জোতদারের কাছেই ভ,সম্পত্তি বৃদ্ধির সংযোগ সম্প্রসারিত হয়েছিল। সাধারণ কৃষকদের সিংহভাগেরই জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে নি। তব, ঐতিহাসিক ক্রেগের মতের প্রতিধ্বনি করে বলা যায় যে, ভ,মিদাসদের মাক্তির ঘোষণার পর স্টীলপিনের সংস্কার একটি গরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ৷
স্টলিপিনের সবচেয়ে বড় এটি এই যে, তাঁর প্রবর্তিতে সংস্কারের যুক্তিসঙ্গত সীমানায় পৌঁছতে তাঁর অনিচ্ছা ছিল। কেননা অন্তরে তিনি উদারনৈতিক ছিলেন সংস্কারের এটি যায় ( ১৯১১ খ্রীঃ ) । না। অথচ প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁকে উদারপন্থী বলে নিন্দা করেছে । অবশেষে এক আততায়ীর হাতে তাঁর জীবনদীপ নিভে যায় (১৯১১)

