জনঘনত্ব ও বণ্টনের তারতম্যের কারণ – বিস্তারিত আলোচনা
পৃথিবীর সব স্থানে মানুষ সমানভাবে বসবাস করে না। কোথাও মানুষের ভিড় খুব বেশি, আবার কোথাও মাইলের পর মাইল জনমানবহীন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের ঢাকা শহরে বা ভারতের কলকাতায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে হাজার হাজার মানুষ বাস করে, অথচ সাহারা মরুভূমি বা অ্যান্টার্কটিকায় জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন এই পার্থক্য?
একজন ভূগোল বা সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জনঘনত্ব ও বণ্টনের তারতম্যের কারণ (Causes of uneven distribution of population) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই নোটটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতে পারে।
জনঘনত্ব ও জনসংখ্যার বণ্টন কী? (Introduction)
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের দুটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার: ১. জনসংখ্যার বণ্টন (Population Distribution): ভূপৃষ্ঠে মানুষ কীভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাকেই জনসংখ্যার বণ্টন বলা হয়। ২. জনঘনত্ব (Population Density): কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের জায়গায় (সাধারণত প্রতি বর্গকিলোমিটারে) গড়ে কতজন লোক বসবাস করে, তার পরিমাপ হলো জনঘনত্ব।
জনসংখ্যা বণ্টনের এই অসমতার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে: প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণ।
১. প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক কারণসমূহ (Physical Factors)
জনসংবসতি গড়ে ওঠার পেছনে প্রকৃতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বসবাস করে আসছে।
ক) ভূ-প্রকৃতি (Relief or Landforms)
ভূ-প্রকৃতি জনসংখ্যার বণ্টনের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক।
সমতল ভূমি: সমতল ভূমি কৃষি কাজ, যাতায়াত ব্যবস্থা, শিল্প স্থাপন এবং ঘরবাড়ি তৈরির জন্য আদর্শ। তাই নদী অববাহিকা বা সমতল অঞ্চলে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। যেমন— গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা, নীল নদের অববাহিকা এবং চীনের হোয়াংহো অববাহিকা।
পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল: পাহাড়ি এলাকা বা অত্যধিক বন্ধুর ভূ-প্রকৃতিতে জীবনযাপন কষ্টসাধ্য। এখানে কৃষি কাজ করা কঠিন এবং যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত। তাই হিমালয়, আল্পস বা আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলে জনঘনত্ব খুবই কম।
খ) জলবায়ু (Climate)
মানুষ সাধারণত চরমভাবাপন্ন জলবায়ু এড়িয়ে চলে এবং সমভাবাপন্ন জলবায়ু পছন্দ করে।
অনুকূল জলবায়ু: নাতিশীতোষ্ণ এবং মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা মানুষের বসবাসের উপযোগী। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম ইউরোপে জনবসতি খুব ঘন।
প্রতিকূল জলবায়ু: অত্যধিক শীতল (যেমন— মেরু অঞ্চল) বা অত্যধিক উষ্ণ ও শুষ্ক (যেমন— সাহারা মরুভূমি) অঞ্চলে মানুষ বাস করতে পারে না। তাই এসব স্থানে জনবিরলতা দেখা যায়।
আরও জানুন: জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে তা জানতে <a href="https://www.google.com/search?q=https://www.nationalgeographic.com/environment/article/climate-change-overview" target="_blank" rel="noopener noreferrer">ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক</a>-এর এই প্রতিবেদনটি পড়তে পারেন।
গ) নদ-নদী ও জলের প্রাপ্যতা (Water Availability)
"জলের অপর নাম জীবন"—এই কথাটি জনবসতির ক্ষেত্রেও সত্য। প্রাচীন সব সভ্যতাই (যেমন— সিন্ধু, মিশরীয়) নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। পানীয় জল, সেচ এবং জলপথ পরিবহনের সুবিধার জন্য নদী তীরবর্তী এলাকায় জনঘনত্ব সবসময় বেশি থাকে।
ঘ) মৃত্তিকা (Soil)
উর্বর মাটিতে ফসল ভালো হয়, যা কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি। ভারতের গাঙ্গেয় সমভূমি, বাংলাদেশের পলিগঠিত অঞ্চল এবং ইন্দোনেশিয়ার লাভা গঠিত উর্বর অঞ্চলে প্রচুর মানুষ বসবাস করে। অন্যদিকে, মরুভূমির বালুকাময় মাটি বা পর্বতের পাথুরে মাটিতে কৃষি কাজ হয় না বলে সেখানে লোকবসতি কম।
২. অর্থনৈতিক কারণসমূহ (Economic Factors)
বর্তমান যুগে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে অর্থনৈতিক কারণগুলো জনঘনত্বের তারতম্যে বেশি প্রভাব ফেলছে। মানুষ জীবিকার সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে চলে।
ক) শিল্পায়ন (Industrialization)
যেসব এলাকায় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে, সেখানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। শ্রমিক, কারিগর, ইঞ্জিনিয়ার এবং তাদের পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে।
উদাহরণস্বরূপ, জাপানের কোবে-ওসাকা অঞ্চল বা ভারতের মুম্বাই-পুনে শিল্পাঞ্চলে প্রচুর জনসমাগম দেখা যায়। শিল্পের উন্নতির কারণেই মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে।
খ) খনিজ সম্পদ (Mineral Resources)
খনিজ সম্পদ আহরণকে কেন্দ্র করেও জনবসতি গড়ে ওঠে। অনেক সময় দুর্গম এলাকাতেও খনিজ সম্পদ পাওয়া গেলে সেখানে জনবসতি তৈরি হয়।
অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে সোনার খনি থাকার কারণে সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। একইভাবে ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ায় সেখানে জনঘনত্ব বেশি।
গ) নগরায়ন (Urbanization)
শহর বা নগরে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। গ্রামের তুলনায় শহরে জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় মানুষ শহরের দিকে ধাবিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ শহরে বাস করে।
বিশ্ব অর্থনীতি এবং জনসংখ্যা সম্পর্কিত রিসেন্ট ডেটা দেখার জন্য <a href="https://data.worldbank.org/indicator/SP.POP.TOTL" target="_blank" rel="noopener noreferrer">বিশ্ব ব্যাংক (World Bank)</a>-এর ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন।
ঘ) পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা (Transport and Communication)
যেখানে রাস্তাঘাট, রেলপথ বা বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার ঘটে। ফলে সেখানে জনবসতি বৃদ্ধি পায়। দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের অসুবিধার কারণে মানুষ কম বাস করে।
৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণসমূহ (Social and Cultural Factors)
মানুষ সামাজিক জীব। তাই ধর্ম, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা জনবসতি স্থাপনে ভূমিকা রাখে।
ক) ধর্মীয় স্থান
ধর্মীয় কারণে অনেক সময় কোনো নির্দিষ্ট স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে। জেরুজালেম, মক্কা, বারাণসী বা ভ্যাটিকান সিটির মতো শহরগুলো ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেই জনবহুল হয়েছে।
খ) শিক্ষা ও সংস্কৃতি
বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অনেক সময় জনবসতি গড়ে ওঠে। যেমন— শান্তিনিকেতন বা অক্সফোর্ড। উন্নত শিক্ষার আশায় ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা এসব এলাকায় ভিড় করে।
গ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা
যেসব দেশে বা অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে থাকে, সেখান থেকে মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যায়।
যেমন— সিরিয়া বা আফগানিস্তানের যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ইউরোপ বা অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে (Migration)। একে বলা হয় রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা। মানুষ সবসময় শান্তি ও নিরাপত্তা খোঁজে।
স্বাস্থ্য ও জনসুরক্ষা কীভাবে জনসংখ্যাকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে জানতে <a href="https://www.who.int/health-topics/social-determinants-of-health" target="_blank" rel="noopener noreferrer">বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)</a>-এর তথ্য দেখতে পারেন।
৪. জনঘনত্বের সাম্প্রতিক প্রবণতা (Current Trends)
বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে প্রাকৃতিক বাধাগুলো মানুষ কিছুটা কাটিয়ে উঠছে।
মরুভূমিতেও এখন প্রযুক্তির সাহায্যে জল সরবরাহ করে জনবসতি স্থাপন করা হচ্ছে (যেমন— দুবাই)।
তবে, অতিরিক্ত জনঘনত্বের ফলে পরিবেশ দূষণ, যানজট এবং বাসস্থানের অভাব দেখা দিচ্ছে।
উন্নত দেশগুলোতে জন্মহার কম হওয়ায় সেখানে জনঘনত্ব স্থিতিশীল বা কমছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনবিস্ফোরণ একটি বড় সমস্যা।
ব্যক্তিগত পরামর্শ (Personal Advice for Students)
প্রিয় ছাত্রছাত্রী বন্ধুরা, এই বিষয়টি পরীক্ষায় লেখার সময় নিচের টিপসগুলো মেনে চললে তোমরা বেশি নম্বর পাবে:
১. পয়েন্ট করে লেখা: ঢালাওভাবে না লিখে আমি যেভাবে সাবহেডিং (১, ২, ৩...) দিয়েছি, সেভাবে লিখবে। ২. উদাহরণ দেওয়া: প্রতিটি পয়েন্টের সাথে একটি করে বাস্তব উদাহরণ দেবে (যেমন— সমতল ভূমির উদাহরণে বাংলাদেশের নাম)। ৩. ম্যাপ বা ডায়াগ্রাম: সম্ভব হলে পরীক্ষার খাতায় পৃথিবীর বা তোমার দেশের একটি ছোট ম্যাপ এঁকে বেশি এবং কম ঘনত্বের এলাকা চিহ্নিত করে দেবে। এতে পরীক্ষক খুশি হবেন। ৪. তুলনামূলক আলোচনা: প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কারণগুলো যে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা উপসংহারে উল্লেখ করবে।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, জনঘনত্ব ও বণ্টনের তারতম্য কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে হয় না। এটি ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, অর্থনীতি এবং মানুষের সংস্কৃতির এক সম্মিলিত ফলাফল। তবে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাই মানুষকে বেশি প্রভাবিত করছে। মানুষের সুষ্ঠু জীবনযাপনের জন্য সুষম জনসংখ্যা বণ্টন একান্ত কাম্য।
কল টু অ্যাকশন (CTA): এই আর্টিকেলটি কি আপনার উপকারে এসেছে? যদি ভালো লেগে থাকে, তবে আপনার সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করুন। ভূগোল বা পরিবেশ বিষয়ক আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান। আমরা দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব!
দাবিত্যাগ: এই আর্টিকেলের তথ্যগুলো বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং পাঠ্যবই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। শিক্ষার উদ্দেশ্যেই এটি তৈরি করা।

