বিসমার্কের পররাষ্ট্র নীতি Best Online Education
বিসমার্কের পররাষ্ট্র নীতি (১৮৭১-১৮৯০ খ্রীঃ )
পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য (ক) শাস্তি ও স্থিতাবস্থ ব্রহ্মা, (খ) ফ্রান্সকে নিবন্ধিব করে রাখা
লৌহমানব বিসমার্ক' তাঁর 'রক্ত ও লৌহ নীতি'র মাধ্যমে জার্মানীকে ঐক্যবদ্ধ করেন। জার্মানীর ঐক্যের পর তিনি প্রায় দু'দশক জার্মানীর চ্যান্সেলার হিসেবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে জার্মানীকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করেন। তাঁর এই পর্বের ( ১৮৭১'৯০ খ্রীঃ) পররাষ্ট্রনীতি পূর্বের পর্বের ( ১৮৬২-৭১ খ্রীঃ ) পররাষ্ট্রনীতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই পর্বে তাঁর পররাষ্ট্র নীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা রক্ষা করা।
তিনি ঘোষণা করেছিলেন 'জার্মানী পরিতৃপ্ত দেশ' অর্থাৎ তার রাজ্যজয়ের বাসনা আর নেই। তিনি বঝেছিলেন যে, তাঁর শান্তিবাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রবল বাধা হল জার্মানীর ওপর ফ্রান্সের প্রতিশোধস্পৃহা। কেননা ফ্রান্সের কাছ থেকে আলসাসলোরেন ছিনিয়ে নিয়েই জার্মানীর ঐক্য সম্পূর্ণ হয়েছিল। সুতরাং ফ্রান্স যাতে তার
প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে না পারে তার জন্য তাঁর পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ইউরোপে ফ্রান্সকে নির্বান্ধব করে রাখা।
এইজন্য একটি ব্যাপক মৈত্রীব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং জার্মানীর বিরুদ্ধে যাতে প্রতিরোধী মৈত্রীব্যবস্থা গড়ে না ওঠে তার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেন ।
ত্রি-সম্রাট মৈত্রী এবং এর উদ্দেশ্যা
বিসমার্ক'-রচিত মৈত্রী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সম্প্রীতি। বিসমার্কের কাছে স্যাডোয়ার প্রশ্নে ( ১৮৬৬ খ্রীঃ ) অস্ট্রিয়াকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেতে হয়েছিল সত্য, কিন্তু বিসমার্ক— তার সঙ্গে উদার ব্যবহার করেছিলেন । বল্কান অঞ্চলে রাশিয়াকে প্রতিরোধ করার জন্য অস্ট্রিয়া শক্তিশালী মিতের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছিল ।
সুতরাং জার্মানী ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে সখ্যসূত্র স্থাপনে বিসনার্কের উদ্যোগ সফল হয়। অন্যদিকে বিসমার্ক— পর্বেই রাশিয়ার মৈত্রী লাভ করেছিলেন। রাশিয়া প্যারিসের সন্ধির ( ১৮৫৬ খ্রীঃ ) কৃষ্ণসাগর সম্পর্কিত শর্ত গুলি লঙ্ঘন করে ঐ মৈত্রীর পরস্কার লাভ করেছিল।
বিসমার্ক' এক এবং অভিন্ন রাজতান্ত্রিক আদর্শের দোহাই দিয়ে জার্মানী, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাটদের মধ্যে 'ড্রাইকাইজারবন্ড’বা 'ত্রি-সম্রাট মৈত্রী' গড়ে তুললেন ( ১৮৭২ খ্রীঃ ) । এটি কোন লিখিত চুক্তি নয়, একটি গোপন বোঝাপড়া মাত্র। আপাতদৃষ্টিতে এই মৈত্রীর উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ সাম্রাজ্যের অখন্ডতা রক্ষা, নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে নিকট-প্রাচ্য সমস্যার সমাধান ও সর্বোপরি সমাজতন্ত্রবাদের প্রসার রোধ করা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফ্রান্সকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ করে রাখা ।
জার্মান-ফরাসী সম্পক
ত্রি-সম্রাট মৈত্রী গঠন করলেও কাটকৌশলী বিসমার্ক ফ্রান্সের সঙ্গে সম্ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেন। প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সের সঙ্গে উগ্র রাজতন্ত্র-শাসিত অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার মৈত্রী অসম্ভব বলে ফ্রান্সে যাতে প্রজাতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা অক্ষর থাকে সেজন্য সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ‘যুদ্ধ-ভীতি’ জার্মানী-ফ্রান্স সম্পর্ক তিক্ত করে তোলে এবং ‘ত্রি-সম্রাট মৈত্রী'র ওপর আঘাত হানে।
ফ্রান্সের নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ম্যাকমোহন সামরিক সংস্কারের উদ্যোগ নেন । এটি জার্মানীকে আক্রমণ করার প্রস্তুতি ধরে নিয়ে বিসমার্ক' বিচলিত হন। তিনি ফ্রান্সকে এই সামরিক সংস্কার বন্ধের হুমকী দেন, নচেৎ জার্মানী ফ্রান্সকে আক্রমণ করবে। কিন্তু রাশিয়ার জার ঘোষণা করেন যে, আসন্ন জার্মানীফ্রান্স যদ্ধে রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকবে না । ফলে বিসমার্ক' ফ্রান্সের বিরদ্ধে সমরায়োজন থেকে নিরস্ত হন।
ত্ৰি-সম্রাট মৈত্রীর সঙ্কট ও দ্বৈত মৈত্রী (১৮৭১)
কিন্তু বল্কান অঞ্চলে রুশ-অস্ট্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় 'ত্রি সম্রাট মৈত্রীতে' ফাটল ধরে। ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে অননুষ্ঠিত বার্লিন কংগ্রেসে বিসমার্ক— দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে অস্ট্রিয়ার পক্ষ সমর্থন করেন। স্যানস্টিফানোর সন্ধির পানর্বিবেচনা করতে হবে—অস্ট্রিয়ার এই দাবি তিনি সমর্থন করেন। ফলে জার বিসমার্কে'র ওপর অত্যন্ত রুষ্ট হন।
বিসমার্ক— এইবার ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে দ্বৈত মৈত্রী' গড়ে তুললেন । জার্মান-অস্ট্রিয়া সম্প্রীতি ঘনিষ্ঠতর হল। এই সন্ধির দ্বারা স্থির হল তৃতীয় রাষ্ট্র দ্বারা উভয় রাষ্ট্রের কোনটি জাক্রান্ত হলে, অন্য রাষ্ট্রটি আক্রান্ত রাষ্ট্রের সাহায্যে অগ্রসর হবে। স্পষ্টতঃ,
রাশিয়া ও ফ্রান্সের আক্রমণ প্রতিহত করাই ছিল 'দ্বৈত মৈত্রী'র প্রকৃত উদ্দেশ্য ।
ত্রি-শক্তি মৈত্রী গঠন (১৮৮২)
দ্বৈত মৈত্রীর সঙ্গে ইতালীকে যুক্ত করা ছিল বিসমার্কে'র পরবর্তী পদক্ষেপ। ফ্রান্সের সহায়তায় পোগ তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা পনের ধার করতে পারেন ইতালীর এই ভীতিকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন । এছাড়া, উত্তর আফ্রিকার টিউনিসকে কেন্দ্র করে ফরাসী-ইতালী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি ইন্ধন য, গিয়েছিলেন। তিনি টিউনিস দখল করতে ফ্রান্সকে গোপনে উৎসাহিত করেছিলেন।
অবশেষে ফ্রান্স টিউনিস দখল করে নেয় (১৮৮১ খ্রীঃ)। ক্রদ্ধ হয়ে ইতালী দ্বৈত মৈত্রীতে যোগদান করে—এটি এখন ত্রি-শক্তি মৈত্রীতে পরিণত হয় ( ১৮৮২ খ্রীঃ)। কটনীতির যাদকের বিসমার্ক' অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন —প্রায় চির শত্রু, অস্ট্রিয়া ও ইতালীর মধ্যে মৈত্রীবন্ধন গড়ে উঠল ।
ত্রি-মম্রাট মৈত্রীর পূনর, জীবন (১৮৮১)
ত্রি-শক্তি মেত্রী গঠিত হলেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য উদগ্রীব ছিলেন বিসমার্ক— । কেননা রাশিয়া অসন্তুষ্ট হলে ফ্রান্সের সঙ্গে মৈত্রীবদ্ধ হতে পারে । তবে এ ব্যাপারে বিসমার্কের সংবিধে ছিল। জার্মানীঅস্ট্রিয়া মৈত্রী বল্কান অঞ্চলে রুশ স্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে রাশিয়াই ত্রি-সম্রাট মৈত্রী (১৮৭২ খ্রীঃ ) পুনঃরুজ্জীবনের প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাব অনুসারে ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে ঐ তিনটি রাষ্ট্র চতুর্থ কোন ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন একটি যুদ্ধ বাধলে অন্যেরা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে এবং বল্কান প্রশ্নে পারম্পরিক পরামর্শ করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
বুলগেরিয়া সঙ্কট : রি-ইনসিওরেক্স সি (১৮৮৭)
কিন্তু ত্রি-সম্রাট মৈত্রী স্বল্পায়ন হল। বুলগেরিয়া রামেলিয়া রাজ্যটি অধিকার করে একটি ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বুলগেরিয়া গঠন করতে চায়। রাশিয়া এর বিরোধিতা করে, কিন্তু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া সমর্থন জানায়। সতরাং বুলগেরিয়া সঙ্কটের ফলে ত্রি-সম্রাট মৈত্রী ভেঙে যায়। রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন হয়ে ওঠে । এই আসন্ন যদ্ধে মৈত্রীব্যবস্হা অনুসারে বিসমার্ককে রাশিয়ার বিরদ্ধে অস্ট্রিয়ার পক্ষ সমর্থন করতে হত।
কিন্তু এর ফলে রুশ-ফরাসী মৈত্রী গড়ে উঠতে পারে । তাই বিসমার্ক' রাশিয়ার সঙ্গে গোপনে 'রি-ইনসিওরেন্স সন্ধি' নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করলেন (১৮৮৭ খ্রীঃ)। এর দ্বারা স্হির হয় যে, রাশিয়া বা জার্মানী কোন তৃতীয় শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হলে পরস্পর সহায়তাম,লক নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে ।
ইঙ্গ-জার্মান মৈত্রী
কন্ট্রনীতি-বিশারদ বিসমার্ক ফ্রান্সকে ইউরোপে নির্বান্ধব করে রাখার জন্য ইংল্যান্ডের সঙ্গে সম্ভাব বজায় রেখেছিলেন। মিশরের সমস্যা নিয়ে ইঙ্গ-ফরাসী বিরোধ দেখা দিলে বিসমার্ক— সেই সংযোগের সদ্ব্যবহার করেন । এছাড়া, তিনি নৌবাহিনী গঠন ও উপনিবেশ- বিস্তারের নীতি অবলম্বন না করায় ইংল্যান্ডের অসন্তোষের কারণ ঘটে নি। তিনি বলেছিলেন যে, “জলম,ষিক” (ইংল্যান্ড) ও “স্থলম, যিকের” (জার্মানী) মধ্যে কোন বিরোধ নেই ।
বিসমার্কের সাফল্য
বিসমার্ক পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে যে সফল হয়েছিলেন সে বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই । বিসমার্কের জটিল মৈত্রীব্যবস্থার জাল ছিন্ন করে মিত্রহীন ফ্রান্স তার প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করার সংযোগ পায় নি। জার্মানীর স্বার্থ ও নিরাপত্তা তিনি বজায় রেখেছিলেন। যথার্থ ভাবেই তাঁর সম্বন্ধে বলা হয় যে, যাদুকরস, লভ দক্ষতার পাঁচটি বল নিয়ে তিনি এমনভাবে খেলতে পারতেন যে সব'দাই অন্ততঃ দুটি বল শূন্যে থাকত।
এই পাঁচটি বলের অর্থ হল অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালী। তাঁর সময়ে বার্লিন ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল । জার্মানীই ছিল ইউরোপীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতির নিয়ন্তা ৷
বিসমার্কের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা:
বিসমার্ক' যতদিন জার্মানীর কর্ণধার ছিলেন ততদিন জার্মানী ছিল শক্তিমত্তায়, মানে মর্যাদায় নিঃসন্দেহে সর্বাগ্রগণ্য দেশ । বৈদেশিক ক্ষেত্রে বিসমার্কের এই সাফল্যের দ্যুতিতে তাঁর পররাষ্ট্র নীতির বহু ত্রুটি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সেই সমস্ত এটি তাঁর আমলে না হলেও পরবর্তীকালে প্রকট হয়ে উঠেছিল। সেই ত্রুটিগুলি ছিল নিম্নরূপ।
প্রথমতঃ, রাজনৈতিক জোটের চিন্তায় তিনি বিভীষিকা দেখেন এজাতীয় উক্তি বিসমার্ক— একদা করেছিলেন, অথচ রাজনৈতিক জোটের পত্তন তিনি নিজেই করে গিয়েছিলেন। তিনি যে একাধিক মৈত্রীব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন রাজনৈতিক জোটের তার মধ্যেই নিহিত ছিল প্রতিরোধী মৈত্রী ব্যবস্থার বাঁজ। ঐতিহাসিক গ্ল্যান্ট ও টেম্পারলি যথার্থই বলেছেন যে বিসমার্ক স্থাপিত মৈত্রীব্যবস্থা ছিল প্রতিযোগিতামূলক মৈত্রী ( "Competitive alliance” )।
এক এবং অভিন্ন স্বার্থ বোধের প্রেরণায় সহযোগিতাম,লক কোন মৈত্রী সংঘ এটি ছিল না। একটি শক্তিসাম্যের ভিত্তিতে গঠিত মৈত্রী ব্যবস্থা বলাই সঙ্গত। বিসমার্ক যতদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন এই মৈত্রীব্যবস্থা জার্মানীর স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষা করেছিল, কিন্তু, তারপর ধীরে ধীরে ইউরোপ দই সশস্ত্র শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর ফল শেষ পর্যন্ত জার্মানীর পক্ষে বিপর্যয়কর হয়েছিল। সে সুতরাং এই সমস্ত ঘটনার পরোক্ষ দায়িত্ব থেকে বিসমার্ক' অব্যাহতি পেতে পারেন না ।
মৈত্রী ব্যবস্থার জটिলা দ্বিতীয়তঃ, ইউরোপে জার্মানীর প্রাধান্য বজায় রাখতে ও নির্বিঘ্ন করে তুলতে গিয়ে বিসনাক' করেছিলেন যে, আলসাস-লোরেনকে ঘিরে যে জার্মান-ফরাসী বিরোধ দেখা দিয়েছিল তার মোকাবিলা করতে হবে । সেজন্য তিনি তাঁর ক‚টনৈতিক মোহজাল বিস্তার করে কতকগুলি বিরোধকে জাইয়ে রেখে ফ্রান্স-বিরোধী মৈত্রীব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
সেই বিরোধগুলি হল –
(১) বল্কান আধিপত্য নিয়ে র,শ-অস্ট্রিয়া বিরোধ, (২) * "অমর" ইতালীয় ভ খণ্ড নিয়ে অস্ট্রিয়া-ইতালী বিরোধ,
(৩) টিউনিসকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সইতালী বিরোধ, (৪) রাশ-অস্ট্রিয়া বিরোধে বিসনাকে'র অস্ট্রিয়ার প্রতি পক্ষপাতিত্বের
ইতালী ঐক্যবদ্ধ ( ১৮৭০ খ্রীঃ) হলেও ট্রিরেস্ট ও ট্রেনটিনো অস্ট্রিয়ার অধীনে থেকে যায় । এই তখণ্ড “অম, ইতালী" নামে অভিহিত ছিল। এছাড়া, আড্রিয়াটিক অঞ্চলেও অস্ট্রিয়া-ইতালী বিরোধ ছিল। জন্য জার্মান-রূশ বিরোধ, (৫) বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে ইঙ্গ-জার্মান বিরোধ। শেষোক্ত বিরোধটি বিসমার্ক চাপা দিয়ে রেখেছিলেন জার্মানীর জন্য ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গঠন না করে, কেননা সেক্ষেত্রে ইংরেজদের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
বিসমার্কের ক্ষমতাচ্যুতির পর এই বিরোধটি প্রত্যক্ষ রূপ ধারণ করেছিল। আবার মৈত্রীব্যবস্থা অনসারে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে, জার্মানীকে অস্ট্রিয়ার পক্ষ সমর্থন করে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হত। এজন্য প্রকৃতপক্ষে বিসমার্ক— দম,খো নীতি অবলম্বন করেছিলেন—অস্ট্রিয়াকে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আবার অস্ট্রিয়ার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্বের জন্য রাশিয়া যাতে তাঁর পক্ষ ত্যাগ না করে তা প্রতিরোধ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
কিন্তু, ধীরে ধীরে রাশিয়া তাঁর মোহজাল ছিন্ন করে ফ্রান্সের দিকে ঝাঁকতে থাকে এবং তাঁর পদচ্যুতির পরেই রুশফরাসী মৈত্রী ঘোষিত হয় এবং তাঁর মৈত্র।ব্যবস্থার কাঠামো ভেঙে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে, বিসমার্ক—-রচিত মৈত্রীব্যবস্থা ছিল জটিল ও অতি সক্ষম ; বিসমার্কের তুলনায় কৰ্টেনীতিতে কম জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদের পক্ষে সাষ্ঠ, পরিচালনা ছিল দরহে।
তৃতীয়তঃ, বিসমার্ক— ফ্রান্সের আলসাস-লোরেন প্রদেশ দুটি বলপূর্বক জার্মানীর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি পরাজিত শত্রুর প্রতি সদয় ব্যবহার করে ফ্রান্সের প্রতি অন্য দায়তা তাকে পরাজয় ও ক্ষয়-ক্ষতির তিক্ত স্বাদ বিস্মৃত হতে সাহায্য করেন নি। উপরন্তু, তিনি ফ্রান্সকে ইউরোপে ব্রাত্য করে রেখেছিলেন !
ফ্রান্সের এই অঙ্গহানি জাতীয় জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল । তাই প্রতিশোধস্পৃহা ফরাসী জাতির মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল । এই ফরাসী-জার্মান বিরোধের সঙ্গে বল্কান অঞ্চলে রাশ-অস্ট্রিয়া বিরোধ এবং বাণিজ্য-উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে ইঈ-জার্মান বিরোধ যুক্ত হয়ে প্রথম বিশ্বযদ্ধের পটভূমিকা প্রস্তুত করেছিল। সতরাং বিসমার্কীয় মৈত্রীব্যবস্থার দূরপ্রসারী ফল হয়েছিল মারাত্মক ।
চতুর্থ ডঃ, জার্মানীর দ্রুত শিল্পায়ন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গঠনের প্রয়োজনীয়তা জররা করে তুলেছিল। কিন্তু পাছে জার্মানী ইংল্যান্ডের বিরাগভাজন হয়ে পড়ে, সেই ভয়ে তিনি উপনিবেশ বিস্তারে আগ্রহ দেখান নি। কিন্তু উপনিবেশ বিস্তারে শিল্প-সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করার পর উপনিবেশ স্থাপনে তিনি অনাগ্রহ তত্পর হতে বাধ্য হন ।
কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিগুলি লাভজনক স্থানগুলি দখল করে নিয়েছিল। সতরাং এ ব্যাপারে জার্মান জাতি অতৃপ্ত থেকে গেল । পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযদ্ধে সংঘটনে এই অতৃপ্তি কম দায়ী ছিল না ।
প্রত্যক্ষ ফল
উপরোক্ত ত্রুটি সত্ত্বেও বিসমার্কের পররাষ্ট্র নীতির প্রত্যক্ষ ফল উল্লেখের দাবি রাখে। এর ফলে ইউরোপে শান্তি বজায় ছিল, জার্মান সাম্রাজ্যের প্রাধান্য অর্জিত ও সংরক্ষিত হয়েছিল এবং ফ্রান্সের নিঃসঙ্গতা দূর হয় নি । এক কথায়, বিসমার্ক' যতদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তাঁর মৈত্রী পদ্ধতির সংষ্ঠ, রূপায়ণ ঘটেছিল। “কর্ণধারের বিদায়ের” পর কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের হাতে এটি বিপর্যস্ত হয়ে যায়

