ভারত ও জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণ | দ্বাদশ শ্রেণীর ভূগোল নোটস

Best Online Education
By -
0

 

ভারত ও জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণ: একটি তুলনামূলক আলোচনা (দ্বাদশ শ্রেণী)


ভারত-ও-জাপানের-লোহা-ইস্পাত-শিল্পের-উন্নতির-কারণ


ভূমিকা

লোহা-ইস্পাত শিল্পকে বলা হয় ‘সকল শিল্পের মেরুদণ্ড’। আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখতে এই শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বাদশ শ্রেণীর ভূগোলের অর্থনৈতিক অংশে ভারত ও জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিশ্বের লোহা-ইস্পাত উৎপাদনের মানচিত্রে ভারত এবং জাপান—উভয় দেশই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই দুই দেশের শিল্পের উন্নতির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত যেখানে তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে এই শিল্প গড়ে তুলেছে, সেখানে জাপান প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার জোরে এই শিল্পে বিশ্বসেরা হয়েছে।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ভারত ও জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণগুলি সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচনা করব, যা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করবে।

ভারতের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণসমূহ

ভারত বর্তমানে বিশ্বে কাঁচা ইস্পাত বা ক্রুড স্টিল উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছে। ভারতের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা এবং সরকারি উদ্যোগের এক চমৎকার সংমিশ্রণ। নিচে ভারতের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির প্রধান কারণগুলি আলোচনা করা হলো:

১. কাঁচামালের সহজলভ্যতা (Availability of Raw Materials)

ভারতের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির প্রধান কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরেই প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের কাঁচামালের উপস্থিতি।

  • আকরিক লোহা: ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় এবং কর্ণাটকে প্রচুর পরিমাণে হেমাটাইট ও ম্যাগনেটাইট জাতীয় উন্নত মানের আকরিক লোহা পাওয়া যায়। জামশেদপুর, ভিলাই, রৌরকেল্লা—সবকটি কেন্দ্রই খনি অঞ্চলের খুব কাছে অবস্থিত।

  • কয়লা: ইস্পাত গলানোর জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। দামোদর উপত্যকা অঞ্চলের রানীগঞ্জ ও ঝরিয়া খনি থেকে উন্নত মানের কোক কয়লা সহজেই পাওয়া যায়।

  • চুনাপাথর ও ডলোমাইট: ইস্পাত তৈরির ফ্লাক্স হিসেবে ব্যবহৃত চুনাপাথর ও ডলোমাইট ওড়িশার সুন্দরগড় ও বীরમિત্রপুর থেকে সহজেই সংগ্রহ করা যায়।

২. শক্তির যোগান (Power Supply)

লোহা-ইস্পাত একটি শক্তি-নির্ভর শিল্প। ভারতের ইস্পাত কেন্দ্রগুলি মূলত দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) এবং মহানদী ভ্যালি প্রকল্প থেকে প্রয়োজনীয় জলবিদ্যুৎ ও তাপবিদ্যুৎ পেয়ে থাকে। এই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সচল রাখে।

৩. জলের সুব্যবস্থা (Water Availability)

ইস্পাত কারখানাগুলিতে কুলিং বা ঠান্ডা করার জন্য এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। ভারতের প্রধান ইস্পাত কেন্দ্রগুলি সুবর্ণরেখা, দামোদর, মহানদী এবং ব্রাহ্মণী নদীর তীরে গড়ে ওঠায় জলের কোনো অভাব হয় না।

৪. সস্তা ও দক্ষ শ্রমিক (Cheap and Skilled Labor)

ভারত একটি জনবহুল দেশ। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড থেকে খুব কম মজুরিতে প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং আইটিআই (ITI) থেকে পাস করা দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের সংখ্যাও বেড়েছে, যা এই শিল্পের আধুনিকীকরণে সাহায্য করছে।

৫. উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা (Transport Network)

ভারতের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতিতে <a href="https://indianrailways.gov.in/" target="_blank">ভারতীয় রেলওয়ে</a> (Indian Railways) এবং সড়ক পথের ভূমিকা অনস্বীকার্য। খনি থেকে কারখানায় কাঁচামাল আনা এবং কারখানা থেকে ফিনিশড গুডস বা তৈরি মাল বাজারে বা বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

৬. বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার (Domestic Market)

ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। দেশে প্রতিনিয়ত বাড়িঘর, ব্রিজ, রেলপথ, মেট্রো এবং অটোমোবাইল শিল্প বাড়ছে। ফলে দেশের ভেতরেই লোহা ও ইস্পাতের এক বিশাল চাহিদা রয়েছে, যা এই শিল্পের বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করে।

ব্যক্তিগত পরামর্শ: পরীক্ষার খাতায় যখন ভারতের অংশের উত্তর লিখবে, তখন অবশ্যই ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের একটি ম্যাপ আঁকার চেষ্টা করবে। এতে পরীক্ষক খুশি হন এবং নম্বর বাড়ে।

জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণসমূহ

জাপান এশিয়ার একটি উন্নত দেশ এবং লোহা-ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাপানে লোহা-ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল—যেমন আকরিক লোহা বা কয়লা—প্রায় কিছুই নেই। তবুও জাপান এই শিল্পে এত উন্নত কেন? এর কারণগুলি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. সুবিধাজনক উপকূলীয় অবস্থান (Coastal Location)

জাপানের লোহা-ইস্পাত কেন্দ্রগুলি মূলত সমুদ্র উপকূলে বা বন্দরের খুব কাছে গড়ে উঠেছে। একে বলা হয় 'Break of Bulk' পয়েন্ট। এর ফলে বিদেশ থেকে বড় বড় জাহাজে করে কাঁচামাল আমদানি করে সরাসরি কারখানায় নেওয়া যায় এবং পণ্য তৈরি হওয়ার পর তা সহজেই জাহাজে করে বিদেশে রপ্তানি করা যায়। এতে পরিবহন খরচ অনেক কমে যায়।

২. উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিকীকরণ (Advanced Technology)

জাপান প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ। তারা লোহা-ইস্পাত উৎপাদনে LD কনভার্টার এবং ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (Electric Arc Furnace) এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তির ফলে কম কাঁচামালে বেশি এবং উন্নত মানের ইস্পাত উৎপাদন করা সম্ভব হয়। জাপানি ইস্পাতের গুণগত মান সারা বিশ্বে সমাদৃত।

৩. কাঁচামাল আমদানি করার সুবিধা (Easy Import of Raw Materials)

জাপান নিজের দেশে কাঁচামাল না থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তা আমদানি করে:

  • আকরিক লোহা: অস্ট্রেলিয়া, ভারত (গোয়া ও বিশাখাপত্তনম থেকে), ব্রাজিল এবং ফিলিপাইন থেকে আমদানি করে।

  • কয়লা: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং চীন থেকে উন্নত মানের কোক কয়লা আমদানি করে।

  • স্ক্র্যাপ আইরন: জাপান প্রচুর পরিমাণে পুরনো লোহা বা স্ক্র্যাপ আইরন রিসাইকেল করে ইস্পাত তৈরি করে, যা খরচ কমায়।

৪. সুলভ জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তি (Hydro & Nuclear Power)

জাপান একটি পাহাড়ি দেশ, তাই এখানে খরস্রোতা নদী থেকে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এছাড়া জাপানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকেও ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেওয়া হয়।

৫. দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্কৃতি (Skilled Workforce & Work Culture)

জাপানি শ্রমিকরা অত্যন্ত পরিশ্রমী, দেশপ্রেমিক এবং দক্ষ। তাদের কর্মসংস্কৃতি (Work Culture) এবং নিয়মানুবর্তিতা শিল্পের উন্নতির এক বড় কারণ। জাপানে ধর্মঘটের হার খুব কম, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় না।

৬. বিশ্বব্যাপী বাজার ও চাহিদা (Global Market)

জাপান বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ নির্মাণকারী এবং অটোমোবাইল (গাড়ি) উৎপাদনকারী দেশ। টয়োটা, হোন্ডা, সুজুকির মতো কোম্পানির গাড়ির জন্য প্রচুর উচ্চমানের ইস্পাতের প্রয়োজন হয়। এছাড়া জাপানি ইস্পাতের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

আপনি যদি বিশ্বব্যাপী ইস্পাত উৎপাদনের পরিসংখ্যান দেখতে চান, তবে <a href="https://worldsteel.org/" target="_blank">World Steel Association</a> এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটি দেখতে পারেন।

ভারত ও জাপানের শিল্পের মূল পার্থক্য (Comparative Summary)

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য এই তুলনাটি মনে রাখা জরুরি:

বিষয়

ভারত

জাপান

ভিত্তি

কাঁচামাল ভিত্তিক শিল্প (Raw Material Oriented)।

বাজার ও বন্দরের উপর নির্ভরশীল শিল্প (Market- and Port-Based 

অবস্থান

মূলত খনি অঞ্চলের কাছে (যেমন: জামশেদপুর)।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় (যেমন: টোকিও-ইয়োকোহামা)।

প্রযুক্তি

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তবে এখনো শ্রমঘন।

সম্পূর্ণ অটোমেটেড ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর।

রপ্তানি

নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সামান্য রপ্তানি করে।

উৎপাদনের বড় অংশই রপ্তানি নির্ভর।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভারত এবং জাপান উভয় দেশই নিজ নিজ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে লোহা-ইস্পাত শিল্পে উন্নতি করেছে। ভারত যেখানে তার অফুরন্ত খনিজ সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, জাপান সেখানে মানুষের মেধা, প্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজয় করেছে।

ভবিষ্যতে ভারতের উচিত জাপানের মতো প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন স্টিল (Green Steel) উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বিষয়টি বোঝা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি বোঝার জন্যও জরুরি।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. জাপানের ম্যানচেস্টার কাকে বলা হয়? জাপানের ওসাকা শহরকে জাপানের ম্যানচেস্টার বলা হয়, যদিও এটি বস্ত্রবয়ন শিল্পের জন্য বিখ্যাত, তবে এই অঞ্চলটি শিল্পে অত্যন্ত উন্নত।

২. ভারতের বৃহত্তম লোহা-ইস্পাত কেন্দ্র কোনটি? বর্তমানে ভিলাই (Bhilai) ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এবং উৎপাদনশীল লোহা-ইস্পাত কেন্দ্র।

৩. জাপানের লোহা-ইস্পাত শিল্পের প্রধান অঞ্চল কোনটি? টোকিও-ইয়োকোহামা অঞ্চল এবং কিটা-কিউশু অঞ্চল হলো জাপানের প্রধান ইস্পাত উৎপাদনকারী বলয়।

Call to Action (CTA): প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, আশা করি এই নোটটি তোমাদের উপকারে আসবে। যদি এই আর্টিকেলটি তোমাদের ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করো। ভূগোল বা অর্থনীতি বিষয়ক আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করে জানাও। আমরা শীঘ্রই সেই বিষয়ের ওপর সহজ নোটস নিয়ে হাজির হবো।

Tags:

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default