কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি: উৎস, বিষয়বস্তু ও সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ | কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী

Best Online Education
By -
0

 

কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি: উৎস, বিষয়বস্তু ও সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ | কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী

বিষয়: নবম শ্রেণি বাংলা সাহিত্য (WBBSE Class 9 Bengali) | মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য

ভূমিকা

কলিঙ্গদেশে-ঝড়-বৃষ্টি


মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্যের ধারা এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। আর এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হলেন কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তাঁর রচিত 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের আখেটিক খণ্ড বা কালকেতু উপাখ্যানের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো "কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি"

প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের জীবনে কীভাবে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে এবং দেবতার মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে কবি কীভাবে বাস্তবসম্মত বর্ণনা দিয়েছেন, তা এই কবিতায় ফুটে উঠেছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা এই কবিতার উৎস, বিষয়বস্তু, ঝড়-বৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা এবং নামকরণের সার্থকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই নোটটি ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।

১. কবিতার উৎস (Origin of the Poem)

সাহিত্যের যেকোনো আলোচনার প্রথমেই তার উৎস সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।

  • মূল কাব্য: 'কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি' পদ্যটি কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের অন্তর্গত।

  • নির্দিষ্ট খণ্ড: চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধানত দুটি খণ্ড রয়েছে—'আখেটিক খণ্ড' (কালকেতু উপাখ্যান) এবং 'বণিক খণ্ড' (ধনপতি উপাখ্যান)। আলোচ্য পাঠ্যাংশটি 'আখেটিক খণ্ড' থেকে গৃহীত হয়েছে।

  • প্রেক্ষাপট: দেবী চণ্ডী চেয়েছিলেন মর্ত্যে তাঁর পূজা প্রচার করতে। সেই উদ্দেশ্যে তিনি কালকেতু ও ফুল্লরাকে দিয়ে গুজরাট নগর পত্তন করেন। কিন্তু নতুন নগরে প্রজা না থাকলে রাজ্য চলে না। তাই পার্শ্ববর্তী কলিঙ্গ রাজ্য থেকে প্রজাদের গুজরাটে নিয়ে আসার জন্য দেবী চণ্ডী কলিঙ্গ দেশে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা প্রলয় সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করেন। এই প্রলয়ের বর্ণনাটিই আমাদের পাঠ্য।

অতিরিক্ত তথ্য: মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে 'দুঃখের কবি' বা 'বাস্তবতার কবি' বলা হয়। তাঁর কাব্যে তৎকালীন রাঢ় বাংলার সমাজজীবনের নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়।

২. কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি কবিতার বিষয়বস্তু (Subject Matter)

কবিতাটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত নাটকীয় এবং ঘটনাবহুল। দেবী চণ্ডীর আদেশে কলিঙ্গ দেশে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তার ধারাবাহিক বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

ক. মেঘের আগমন ও অন্ধকার

কবিতার শুরুতেই দেখা যায় আকাশের ঈশান কোণে (উত্তর-পূর্ব কোণ) মেঘ জমা হতে। মুহূর্তের মধ্যে সেই মেঘ সমগ্র আকাশ ছেয়ে ফেলে। অন্ধকার এতটাই ঘন হয়ে ওঠে যে, মানুষ নিজের শরীর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিল না।

খ. দেবরাজ ইন্দ্র ও ঝড়ের তান্ডব

দেবী চণ্ডীর আদেশে আকাশ, বিদ্যুৎ ও বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র মেঘেদের তলব করেন। ঈশান কোণে বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মেঘের প্রবল গর্জন। মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। চার প্রকার মেঘ—সম্বর্ত, আবর্ত, পুষ্কর ও দ্রোণ—মিলে কলিঙ্গে প্রলয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

গ. প্রজাদের দুর্দশা ও পলায়ন

ঝড় ও বৃষ্টির দাপটে কলিঙ্গের প্রজারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হুরহুর করে দূর থেকে ঝড়ের শব্দ ভেসে আসে। ধুলোর আস্তরণে সবুজ শস্যক্ষেত্র ঢেকে যায়। আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় প্রজারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে।

ঘ. প্রকৃতির ধ্বংসলীলা

  • শস্যহানি: প্রবল বর্ষণে ক্ষেতের ফসল উল্টে পড়ে যায়। ধানের শীষ সব নষ্ট হয়ে যায়।

  • শিলাবৃষ্টি: ভাদ্র মাসের তালের মতো বড় বড় শিলা আকাশ থেকে পড়তে থাকে, যা ঘরের চাল ও মেঝে ভেদ করে দেয়।

  • বজ্রপাত: ঘন ঘন বজ্রপাতের শব্দে কেউ কারো কথা শুনতে পায় না।

  • বন্যা: প্রবল বৃষ্টির ফলে কলিঙ্গ দেশ জলে ভেসে যায়। জল-স্থলের ভেদ মুছে যায়। সাপেরা গর্ত ছেড়ে জলে ভেসে বেড়াতে থাকে।

ঙ. হনুমান ও চণ্ডীর মায়া

ঝড়ের তান্ডবেও যখন ধ্বংস সম্পূর্ণ হলো না, তখন দেবী চণ্ডীর আদেশে বীর হনুমান লঙ্কাকাণ্ডের মতো ধ্বংসলীলা চালায়। মঠ, অট্টালিকা সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কলিঙ্গের মানুষ এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে ঋষি জৈমিনিকে স্মরণ করতে থাকে।

৩. কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টির বর্ণনা (Description of the Storm)

মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর কবিতায় ঝড়ের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা যেমন ভীতিপ্রদ, তেমনই বাস্তবসম্মত। এই বর্ণনাকে আমরা কয়েকটি পয়েন্টে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি:

১. আকাশ ও পরিবেশের পরিবর্তন

কবি লিখেছেন—

"মেঘে কৈল অন্ধকার মেঘে কৈল অন্ধকার। দেখিতে না পায় কেহ অঙ্গ আপনার।।"

অর্থাৎ, মেঘের ঘনঘটা এতটাই তীব্র ছিল যে দিনদুপুরেই রাতের মতো অন্ধকার নেমে এসেছিল। ঈশান কোণে মেঘ জমা হওয়ার পর উত্তর পবনে (উত্তুরে হাওয়ায়) সেই মেঘ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

২. বৃষ্টির তীব্রতা (মুষলধারে বর্ষণ)

বৃষ্টির তীব্রতা বোঝাতে কবি 'মুষলধারে' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আটটি দিকের সবকটি দিক থেকে যেন একসঙ্গে বৃষ্টি নামছে। ব্যাঙের (দাদুরী) ডাকের সঙ্গে বৃষ্টির শব্দ মিশে এক ভয়াল পরিবেশ তৈরি করেছিল। কবি বলেছেন, সাত দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি চলার ফলে জল এবং স্থলের কোনো পার্থক্য ছিল না।

৩. বজ্রপাত ও শব্দ

বৃষ্টির সঙ্গে ছিল মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন এবং ঘন ঘন বজ্রপাত। কবি উল্লেখ করেছেন, "কেউ কারোর কথা শুনিতে না পায়"—অর্থাৎ ঝড়ের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

৪. শিলাবৃষ্টির উপমা

শিলাবৃষ্টির বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, ঘরের চাল ভেদ করে যে শিলা পড়ছে, তা যেন ভাদ্র মাসের পাকা তালের মতো। আবার কখনো বলেছেন, "ইটের মতন ফলেরা পড়িছে"—অর্থাৎ শিলাগুলো ছিল ইটের মতো শক্ত ও ভারী।

৫. বন্যার ভয়াবহতা

সাত দিনের টানা বৃষ্টিতে কলিঙ্গ দেশ বন্যায় প্লাবিত হয়। রাস্তাঘাট, ক্ষেতখামার সব জলের তলায় চলে যায়। সাপেরা গর্তে থাকতে না পেরে জলে ভেসে বেড়ায়। কৃষকের সাধের ফসল নষ্ট হয়ে যায়, যা দেখে মনে হয় যেন শস্যক্ষেত উল্টে পড়ে আছে।

৪. নামকরণের সার্থকতা (Significance of the Title)

সাহিত্যে নামকরণের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণত সাহিত্যের নামকরণ হয় চরিত্রকেন্দ্রিক, বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক অথবা ব্যঞ্জনাধর্মী। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা এই পাঠ্যাংশটির নাম 'কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি' রাখা হয়েছে বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে।

যুক্তি ও বিশ্লেষণ:

  1. ঘটনাপ্রবাহ: কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কলিঙ্গ দেশে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের বর্ণনা রয়েছে। মেঘের আগমন, অন্ধকার, প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাত, বন্যা এবং তার ফলে জনজীবনের বিপর্যয়—এই সবকিছুই কবিতার মূল উপজীব্য।

  2. কেন্দ্রীয় ভাব: এখানে কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র নায়ক হয়ে ওঠেনি, বরং 'প্রকৃতি' এবং তার 'রুদ্ররূপ'ই প্রধান হয়ে উঠেছে। কলিঙ্গ রাজ্যের সমৃদ্ধি কীভাবে ঝড়-বৃষ্টির দাপটে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, তাই এখানে মুখ্য।

  3. পরিণতি: এই ঝড়-বৃষ্টির ফলেই কলিঙ্গের প্রজারা তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে গুজরাটের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়, যা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের পরবর্তী ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সিদ্ধান্ত: যেহেতু সমগ্র কবিতাটিতে কলিঙ্গ দেশের ঝড়, বৃষ্টি এবং তার ধ্বংসলীলার কথাই একমাত্র আলোচ্য বিষয়, তাই 'কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি' নামটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, সঙ্গত এবং সার্থক হয়েছে।

৫. ছাত্রছাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত কিছু টিপস ও তথ্যাবলি

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে উত্তরের গুণমান বজায় রাখা জরুরি। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দেওয়া হলো যা তোমাদের উত্তরকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে:

  • ঋষি জৈমিনি কে? ঝড়-বৃষ্টির সময় কলিঙ্গের মানুষ ঋষি জৈমিনিকে স্মরণ করেছিল। তিনি ছিলেন পূর্বমীমাংসা দর্শনের রচয়িতা এবং মহাভারতের একজন বিখ্যাত ঋষি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বজ্রপাতের সময় জৈমিনি ঋষির নাম করলে বজ্রপাত বন্ধ হয় বা ক্ষতি হয় না।

  • চারি মেঘের নাম: পুরাণে বর্ণিত চারটি প্রধান মেঘ হলো—আবর্ভ, সম্বর্ত, পুষ্কর এবং দ্রোণ। কবি মুকুন্দরাম কবিতায় এই চারটি মেঘের কথা উল্লেখ করেছেন যা একসঙ্গে প্রলয় সৃষ্টি করেছিল।

  • উপমার ব্যবহার: কবি মুকুন্দরাম বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল রেখে উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন—শিলাবৃষ্টিকে ভাদ্র মাসের তালের সঙ্গে তুলনা করা বা সাপকে গর্তছাড়া হয়ে জলে ভাসতে দেখা। এই উপমাগুলো উত্তর লেখার সময় অবশ্যই উল্লেখ করবে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (Short Q&A)

  1. কলিঙ্গে কত দিন ধরে বৃষ্টি হয়েছিল?

    • উত্তর: সাত দিন ধরে।

  2. কার আদেশে এই ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল?

    • উত্তর: দেবী চণ্ডীর আদেশে।

  3. ঈশান কোণ বলতে কোন দিক বোঝায়?

    • উত্তর: উত্তর-পূর্ব কোণ।

  4. "দেখিতে না পায় কেহ অঙ্গ আপনার"—কেন?

    • উত্তর: চারদিক মেঘে ঢেকে এতটাই অন্ধকার হয়েছিল যে কেউ নিজের শরীর দেখতে পাচ্ছিল না।

ব্যক্তিগত পরামর্শ ও উপসংহার

প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, 'কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি' কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, এটি মধ্যযুগীয় বাংলার আবহাওয়া ও প্রকৃতির এক অনন্য দলিল। পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় চেষ্টা করবে কবিতার পঙক্তি বা লাইন উদ্ধৃত করতে। যেমন—বন্যার বর্ণনায় "চণ্ডীর আদেশ পান বীর হনুমান / মঠ অট্টালিকা ভাঙ্গি করে খান খান"—এই ধরনের উদ্ধৃতি উত্তরের মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।

পড়ার কৌশল:

  1. প্রথমে কবিতার মূল টেক্সট বা পাঠ্যাংশটি ভালো করে পড়বে।

  2. শব্দার্থগুলো মুখস্থ করবে (যেমন: চিকুর = বিদ্যুৎ, রড় = দৌড়ানো)।

  3. তারপর ওপরে দেওয়া পয়েন্টগুলো অনুযায়ী নিজের ভাষায় উত্তর তৈরি করবে।

আশা করি এই নোটটি তোমাদের পড়াশোনায় অনেক সাহায্য করবে। যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে অবশ্যই জানাবে। শুভকামনা রইল!

Source Reference & External Reading:

Disclaimer: This material is provided solely for learning and informational purposes. The analysis is based on standard literary criticism of medieval Bengali literature.

Tags:

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default