ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য: একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামূলক আলোচনা

Best Online Education
By -
0

 

ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য: একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামূলক আলোচনা
(Salient Features of the Constitution of India in Bengali)

ভারতের-সংবিধানের-বৈশিষ্ট্য


ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো

 ভারতের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে সহজ বাংলায় বিস্তারিত জানুন। লিখিত সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বিচার ব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সহ গুরুত্বপূর্ণ টপিক নিয়ে সাজানো এই শিক্ষামূলক আর্টিকেলটি ছাত্রছাত্রী এবং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

ভূমিকা

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হলো ভারত, আর এই গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড হলো ভারতের সংবিধান। ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত এবং ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি কার্যকরী হওয়া এই সংবিধান বা শাসনতন্ত্র হলো ভারতের সর্বোচ্চ আইন। ডঃ বি আর আম্বেদকরের নেতৃত্বে খসড়া কমিটি দীর্ঘ ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন পরিশ্রম করে এই মহাকাব্যিক দলিলটি প্রস্তুত করেন।

একজন ছাত্র বা সচেতন নাগরিক হিসেবে ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্যগুলি জানা অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (WBCS, UPSC, SSC) প্রস্তুতির জন্য এই আর্টিকেলে সংবিধানের বৈশিষ্ট্যগুলো পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ভারতের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (Main Features)

ভারতের সংবিধানের প্রকৃতি এবং বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যা একে বিশ্বের অন্যান্য সংবিধান থেকে আলাদা করেছে। নিচে সেগুলি আলোচনা করা হলো:

১. বিশ্বের দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান (Lengthiest Written Constitution)

ভারতের সংবিধান হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান। আমেরিকার সংবিধান যেখানে মাত্র ৭টি অনুচ্ছেদ নিয়ে গঠিত, সেখানে ভারতের সংবিধানের ব্যাপ্তি বিশাল।

  • মূল সংবিধান: যখন সংবিধান চালু হয় (১৯৫০), তখন এতে ৩৯৫টি ধারা (Articles), ২২টি অধ্যায় (Parts) এবং ৮টি তফসিল (Schedules) ছিল।

  • বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে বিভিন্ন সংশোধনীর পর এতে প্রায় ৪৪৮টিরও বেশি ধারা, ২৫টি অধ্যায় এবং ১২টি তফসিল রয়েছে।

  • কারণ: ভারতের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য একটিই সংবিধান হওয়ার কারণে এর আকার এত বিশাল হয়েছে।

২. বিভিন্ন উৎস থেকে গৃহীত (Drawn from Various Sources)

ভারতের সংবিধান প্রণেতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করে ভারতীয় পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। তাই অনেকে একে "ঋণ করা সংবিধান" বা "সংকলিত সংবিধান" বলেন।

  • ব্রিটেন: সংসদীয় শাসনব্যবস্থা, আইনের অনুশাসন, একনাগরিকত্ব।

  • আমেরিকা (USA): মৌলিক অধিকার, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, প্রস্তাবনা।

  • আয়ারল্যান্ড: রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (DPSP)।

  • কানাডা: যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো (শক্তিশালী কেন্দ্র)।

  • রাশিয়া (তৎকালীন USSR): মৌলিক কর্তব্য।

  • ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন: সংবিধানের অর্ধেকের বেশি অংশ এই আইন থেকে নেওয়া হয়েছে।

৩. সুপরিবর্তনীয়তা ও দুষ্পরিবর্তনীয়তার মিশ্রণ (Blend of Rigidity and Flexibility)

সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে সংবিধানকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—নমনীয় এবং অনমনীয়। ভারতের সংবিধানে এই দুইয়ের একটি সুন্দর ভারসাম্য রাখা হয়েছে।

  • নমনীয় অংশ: সংবিধানের কিছু অংশ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পার্লামেন্টে পরিবর্তন করা যায় (যেমন—নতুন রাজ্য গঠন)।

  • অনমনীয় অংশ: কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবর্তন করতে হলে সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং অর্ধেক রাজ্যের সম্মতির প্রয়োজন হয় (ধারা ৩৬৮ অনুযায়ী)।

৪. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State)

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে 'ধর্মনিরপেক্ষ' (Secular) শব্দটি প্রস্তাবনায় যুক্ত করা হয়েছে।

  • রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই।

  • সকল নাগরিক তাদের পছন্দমতো ধর্ম পালন, প্রচার ও প্রসার করতে পারে।

  • ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কারো প্রতি বৈষম্য করবে না।

৫. সংসদীয় শাসনব্যবস্থা (Parliamentary Form of Government)

ভারত আমেরিকার মতো রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ব্রিটেনের অনুকরণে 'সংসদীয় শাসনব্যবস্থা' গ্রহণ করেছে।

  • এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হলেন নামমাত্র প্রধান (Nominal Head)।

  • প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত প্রধান (Real Executive)।

  • মন্ত্রীপরিষদ তাদের কাজের জন্য আইনসভার (লোকসভার) কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

৬. মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights)

সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে (Part III) ১২ থেকে ৩৫ নম্বর ধারায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশে অপরিহার্য। বর্তমানে ৬টি মৌলিক অধিকার রয়েছে: ১. সাম্যের অধিকার (ধারা ১৪-১৮) ২. স্বাধীনতার অধিকার (ধারা ১৯-২২) ৩. শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার (ধারা ২৩-২৪) ৪. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (ধারা ২৫-২৮) ৫. সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার (ধারা ২৯-৩০) ৬. সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার (ধারা ৩২)

(নোট: আগে 'সম্পত্তির অধিকার' মৌলিক অধিকার ছিল, কিন্তু ১৯৭৮ সালের ৪৪তম সংশোধনীতে এটিকে আইনি অধিকারে পরিণত করা হয়েছে।)

৭. নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy)

সংবিধানের চতুর্থ অধ্যায়ে (Part IV) ৩৬ থেকে ৫১ নম্বর ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলি বর্ণনা করা হয়েছে। আয়ারল্যান্ড থেকে নেওয়া এই নীতিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতে একটি 'জনকল্যাণকর রাষ্ট্র' (Welfare State) প্রতিষ্ঠা করা। সরকার আইন প্রণয়নের সময় এই নীতিগুলি মাথায় রাখবে। তবে এগুলি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়।

৮. মৌলিক কর্তব্য (Fundamental Duties)

মূল সংবিধানে নাগরিকদের কোনো মৌলিক কর্তব্যের উল্লেখ ছিল না। ১৯৭৬ সালে সর্দার স্বর্ণ সিং কমিটির সুপারিশে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ৫১(ক) ধারায় ১০টি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে আরও ১টি কর্তব্য যুক্ত হয়। বর্তমানে মোট ১১টি মৌলিক কর্তব্য রয়েছে। যেমন—জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে সম্মান করা, পরিবেশ রক্ষা করা ইত্যাদি।

৯. স্বাধীন ও অখণ্ড বিচারব্যবস্থা (Independent and Integrated Judiciary)

ভারতের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং অখণ্ড পিরামিড আকারের।

  • অখণ্ডতা: সবার উপরে সুপ্রিম কোর্ট, তার নিচে হাইকোর্ট এবং তার নিচে জেলা আদালতসমূহ। সুপ্রিম কোর্টের রায় ভারতের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।

  • স্বাধীনতা: বিচারকরা যাতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তার জন্য আইনসভা বা শাসনবিভাগ বিচারবিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

১০. সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার (Universal Adult Franchise)

ভারতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা ধনি-দরিদ্র নির্বিশেষে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের সকল নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। (উল্লেখ্য: ১৯৮৯ সালের আগে ভোটের বয়স ছিল ২১ বছর। ৬১তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তা কমিয়ে ১৮ করা হয়।)

১১. একনাগরিকত্ব (Single Citizenship)

আমেরিকার মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশে 'দ্বি-নাগরিকত্ব' (কেন্দ্রের এবং রাজ্যের আলাদা নাগরিকত্ব) থাকলেও, ভারতে শুধুমাত্র 'একনাগরিকত্ব'-এর ব্যবস্থা রয়েছে। আপনি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হোন বা তামিলনাড়ুর, আপনি শুধুই 'ভারতীয়'। এটি জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১২. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কিন্তু এককেন্দ্রিক প্রবণতা (Federal System with Unitary Bias)

ভারতের শাসনব্যবস্থাকে বলা হয় "গঠনে যুক্তরাষ্ট্রীয় কিন্তু আত্মায় এককেন্দ্রিক"।

  • যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য: লিখিত সংবিধান, সংবিধানের প্রাধান্য, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা।

  • এককেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য: শক্তিশালী কেন্দ্র, একক সংবিধান, একনাগরিকত্ব, রাজ্যপাল নিয়োগ, জরুরি অবস্থা জারি। অধ্যাপক কে.সি. হোয়ার (K.C. Wheare) ভারতকে তাই "আধা-যুক্তরাষ্ট্র" (Quasi-Federal) বলে অভিহিত করেছেন।

১৩. জরুরি অবস্থার বিধান (Emergency Provisions)

দেশের সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৮তম অংশে তিন ধরণের জরুরি অবস্থার কথা বলা হয়েছে: ১. জাতীয় জরুরি অবস্থা (ধারা ৩৫২): যুদ্ধ বা বহিরাগত আক্রমণের সময়। ২. রাজ্য জরুরি অবস্থা বা রাষ্ট্রপতি শাসন (ধারা ৩৫৬): রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে। ৩. আর্থিক জরুরি অবস্থা (ধারা ৩৬০): দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বিপন্ন হলে।

১৪. ত্রি-স্তরীয় সরকার (Three-tier Government)

প্রাথমিকভাবে সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্য—এই দুই স্তরের সরকারের কথা ছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চায়েত রাজ (গ্রামীণ) এবং মিউনিসিপ্যালিটি (শহুরে) ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে ভারত বিশ্বের একমাত্র দেশে পরিণত হয়েছে যেখানে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা রয়েছে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভারতের সংবিধান একটি অনন্য দলিল। এটি কোনো জড় পদার্থ নয়, বরং একটি "জীবন্ত দলিল" (Living Document)। সময়ের প্রয়োজনে এবং পরিস্থিতির দাবি মেনে এটি নিজেকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে চলেছে। ভারতের মতো একটি বিশাল বৈচিত্র্যময় দেশকে গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে এই সংবিধান। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বৈশিষ্ট্যগুলি অনুধাবন করা শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য নয়, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্যও একান্ত প্রয়োজন।


 ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য ১৫ নম্বরের নোটস 

১৫ নম্বরের প্রশ্নের জন্য ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্যগুলি বিস্তারিত এবং পয়েন্ট আকারে লেখা প্রয়োজন। নিচে একটি আদর্শ উত্তরের কাঠামো দেওয়া হলো:

ভারতের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা

ভূমিকা: ভারতের সংবিধান হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন। ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক এটি গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর হয়। ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে খসড়া কমিটি এই সংবিধান রচনা করে। ভারতের সংবিধান তার অনন্য গঠন এবং বিশালত্বের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের সংবিধান থেকে স্বতন্ত্র।

নিচে ভারতের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা হলো:


১. বিশ্বের দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান (Longest Written Constitution)

ভারতের সংবিধান বিশ্বের দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মতো এটি খুব ছোট নয়, আবার ব্রিটেনের সংবিধানের মতো অলিখিতও নয়।

  • গঠন: শুরুতে এতে ৩৯৫টি ধারা (Articles), ২২টি অংশ (Parts) এবং ৮টি তপশিল (Schedules) ছিল। বর্তমানে এতে ৪৭০টির বেশি ধারা, ২৫টি অংশ এবং ১২টি তপশিল রয়েছে।

  • কারণ: ভারতের বিশাল ভৌগোলিক এলাকা, বৈচিত্র্য এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের জন্য একটিই সংবিধান হওয়ার কারণে এটি এত বিশদ।

২. বিভিন্ন উৎসের তথ্যের সমন্বয়ে প্রস্তুত

ভারতের সংবিধান প্রণেতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেছেন। একে অনেক সময় "ঋণ করা সংবিধান" বলা হয়।

  • উদাহরণ: সংসদীয় শাসনব্যবস্থা (ব্রিটেন), মৌলিক অধিকার (আমেরিকা), নির্দেশমূলক নীতি (আয়ারল্যান্ড), এবং জরুরি অবস্থা (জার্মানি) থেকে নেওয়া হয়েছে।

৩. প্রস্তাবনা (Preamble)

সংবিধানের শুরুতে একটি প্রস্তাবনা রয়েছে, যা সংবিধানের দর্শন ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে। এতে ভারতকে একটি 'সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র' (Sovereign, Socialist, Secular, Democratic, Republic) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

৪. নমনীয়তা ও অনমনীয়তার সংমিশ্রণ (Blend of Rigidity and Flexibility)

ভারতের সংবিধান পুরোপুরি অনমনীয় (যেমন—আমেরিকা) বা পুরোপুরি নমনীয় (যেমন—ব্রিটেন) নয়।

  • সংশোধন পদ্ধতি: কিছু ধারা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিবর্তন করা যায়, আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তনের জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজ্যগুলোর সম্মতির প্রয়োজন হয় (ধারা ৩৬৮ অনুযায়ী)।

৫. সংসদীয় শাসনব্যবস্থা (Parliamentary Form of Government)

ব্রিটেনের অনুকরণে ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করা হয়েছে।

  • এখানে রাষ্ট্রপতি হলেন নামসর্বস্ব প্রধান, আর প্রকৃত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে থাকে।

  • আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকে এবং সরকার তার কাজের জন্য লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

৬. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কিন্তু এককেন্দ্রিক প্রবণতা (Federal System with Unitary Bias)

ভারতের সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য (যেমন—ক্ষমতা বণ্টন, লিখিত সংবিধান, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা) থাকলেও এতে শক্তিশালী কেন্দ্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

  • জরুরি অবস্থার সময় বা জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্র রাজ্যগুলোর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। কে.সি. হোয়ার (K.C. Wheare) একে "আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়" (Quasi-Federal) বলে অভিহিত করেছেন।

৭. মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights)

সংবিধানের তৃতীয় অংশে (Part III) ১২ থেকে ৩৫ নম্বর ধারায় ৬টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

  • যেমন: সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ইত্যাদি।

  • এই অধিকারগুলো আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য (Justiciable)।

৮. রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy)

চতুর্থ অংশে (Part IV) ৩৬ থেকে ৫১ নম্বর ধারায় নির্দেশমূলক নীতিগুলো বর্ণিত হয়েছে। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে একটি জনকল্যাণকর রাষ্ট্র (Welfare State) প্রতিষ্ঠা করা। তবে এগুলো আদালতে বলবৎযোগ্য নয়।

৯. মৌলিক কর্তব্য (Fundamental Duties)

মূল সংবিধানে মৌলিক কর্তব্য ছিল না। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে এবং ২০০২ সালে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে বর্তমানে মোট ১১টি মৌলিক কর্তব্য (Part IV-A) যুক্ত করা হয়েছে। দেশপ্রেম রক্ষা ও জাতীয় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ এর অন্তর্ভুক্ত।

১০. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State)

ভারত কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে না। রাষ্ট্র সকল ধর্মকে সমান চোখে দেখে এবং নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটি প্রস্তাবনায় যুক্ত করা হয়।

১১. স্বাধীন ও অখণ্ড বিচারব্যবস্থা (Independent and Integrated Judiciary)

ভারতে একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা রয়েছে যা আইনসভা বা শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

  • সবার উপরে সুপ্রিম কোর্ট, তার নিচে হাইকোর্ট এবং তার নিচে অধস্তন আদালতগুলো অবস্থিত। সুপ্রিম কোর্ট হলো সংবিধানের রক্ষাকর্তা।

১২. সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার (Universal Adult Franchise)

জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের সকল নাগরিকের ভোটাধিকার স্বীকৃত। (৬১তম সংশোধনীর মাধ্যমে বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করা হয়)।

১৩. একক নাগরিকত্ব (Single Citizenship)

আমেরিকার মতো ভারতে দ্বি-নাগরিকত্ব (কেন্দ্র ও রাজ্যের আলাদা নাগরিকত্ব) নেই। সমগ্র ভারতে একই নাগরিকত্ব—'ভারতীয়'। এটি জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।


উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ভারতের সংবিধান একটি গতিশীল দলিল (Living Document)। এটি যেমন ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তেমনি আধুনিক যুগের চাহিদাও পূরণ করে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রকে সফলভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ভূমিকা অনস্বীকার্য।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: ভারতের সংবিধান কবে গৃহীত ও কার্যকরী হয়? উত্তর: ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি কার্যকরী হয়।

প্রশ্ন ২: ভারতীয় সংবিধানের জনক কাকে বলা হয়? উত্তর: ডঃ বি.আর. আম্বেদকরকে ভারতীয় সংবিধানের জনক বলা হয়।

প্রশ্ন ৩: বর্তমানে সংবিধানে কয়টি মৌলিক অধিকার আছে? উত্তর: বর্তমানে ৬টি মৌলিক অধিকার আছে।

প্রশ্ন ৪: ভারতের সংবিধান কি সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রীয়? উত্তর: না, ভারতের সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর হলেও এতে শক্তিশালী কেন্দ্রের উপস্থিতি থাকায় একে আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হয়।

প্রশ্ন ৫: সংবিধানের কোন ধারাকে 'সংবিধানের আত্মা' বলা হয়? উত্তর: ৩২ নম্বর ধারাকে (সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার) ডঃ আম্বেদকর 'সংবিধানের হৃদয় ও আত্মা' বলেছেন। তবে ঠাকুরদাস ভৈরব প্রস্তাবনাকেই সংবিধানের আত্মা বলেছেন।

এই আর্টিকেলটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আরও শিক্ষামূলক তথ্যের জন্য আমাদের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default