বচনের শ্রেণিবিভাগ: যুক্তিবিজ্ঞানের অলিগলি ও বিস্তারিত আলোচনা
যুক্তিবিজ্ঞান বা দর্শনের জগতে প্রবেশ করতে হলে যে বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যিক, তা হলো বচন (Proposition)। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বচনের শ্রেণিবিভাগ একটি ভিত্তিপ্রস্তর। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে কেবল মুখস্থ নয়, বরং বচনের গঠন ও প্রকারভেদ গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায়, উদাহরণের সাহায্যে বচনের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করব।
বচন কাকে বলে? (Definition of Proposition)
সহজ কথায়, যে বাক্যে কোনো কিছু স্বীকার বা অস্বীকার করা হয় এবং যা সত্য বা মিথ্যা হতে পারে, তাকে বচন বলে। সব বাক্য বচন নয়, কিন্তু সব বচনই বাক্য। যুক্তিবিজ্ঞানে আমরা যখন কোনো চিন্তাকে ভাষায় প্রকাশ করি এবং তার মধ্যে সত্যতা বা মিথ্যাত্বের দাবি থাকে, তখনই তা বচনে পরিণত হয়।
যেমন:
বাক্য: "দরজাটি বন্ধ করো।" (এটি আদেশ, সত্য বা মিথ্যা হতে পারে না। তাই এটি বচন নয়।)
বচন: "পৃথিবী হয় গোলাকার।" (এটি সত্য হতে পারে, তাই এটি বচন।)
মনে রাখবেন: বচন হলো ঘোষক বাক্য (Declarative Sentence)। প্রশ্নবোধক, আদেশসূচক বা বিস্ময়সূচক বাক্য কখনো বচন হয় না।
বচনের গঠন (Structure of Proposition)
বচনের শ্রেণিবিভাগে যাওয়ার আগে এর গঠন জানা জরুরি। একটি আদর্শ নিরপেক্ষ বচনের চারটি অংশ থাকে:
১. মানক বা পরিমাণক (Quantifier): যা বচনের পরিমাণ নির্দেশ করে (যেমন- সকল, কোনো, কোনো কোনো)। ২. উদ্দেশ্য পদ (Subject): যার সম্পর্কে কিছু বলা হয়। ৩. বিধেয় পদ (Predicate): উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয়। ৪. সংযোজক (Copula): উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপনকারী শব্দ (হয়/নয়)।
উদাহরণ: সকল (মানক) মানুষ (উদ্দেশ্য) হয় (সংযোজক) মরণশীল (বিধেয়)।
আপনি যদি যুক্তিবিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলো আরও ঝালিয়ে নিতে চান, তবে আমাদের যুক্তিবিজ্ঞানের ভূমিকা আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।
বচনের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Propositions)
বচনকে প্রধানত তিনটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়: ১. সম্বন্ধ অনুসারে (According to Relation) ২. গুণ অনুসারে (According to Quality) ৩. পরিমাণ অনুসারে (According to Quantity) ৪. গুণ ও পরিমাণ উভয়ের ভিত্তিতে (According to Quality and Quantity combined)
নিচে প্রতিটি বিভাগ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. সম্বন্ধ অনুসারে বচনের শ্রেণিবিভাগ
উদ্দেশ্য ও বিধেয় পদের পারস্পরিক সম্বন্ধের ওপর ভিত্তি করে বচনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) নিরপেক্ষ বচন (Categorical Proposition)
যে বচনে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের সম্বন্ধ কোনো শর্তের ওপর নির্ভর করে না, তাকে নিরপেক্ষ বচন বলে। এখানে সরাসরি কোনো কিছু স্বীকার বা অস্বীকার করা হয়।
উদাহরণ: সকল ফুল হয় সুন্দর। (এখানে 'ফুল' সুন্দর হওয়াটা কোনো শর্তের ওপর নির্ভর করছে না।)
খ) সাপেক্ষ বচন (Conditional Proposition)
যে বচনে উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের সম্বন্ধ কোনো না কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল, তাকে সাপেক্ষ বচন বলে। সাপেক্ষ বচন আবার দুই প্রকার:
প্রাকল্পিক বচন (Hypothetical): 'যদি... তবে' দিয়ে যুক্ত বচন।
উদাহরণ: যদি বৃষ্টি হয়, তবে মাটি ভিজবে।
বৈকল্পিক বচন (Disjunctive): 'হয়... অথবা' দিয়ে যুক্ত বচন।
উদাহরণ: হয় সে আসবে, অথবা আমি যাব।
ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরপেক্ষ বচনের বিস্তারিত নোট আমাদের সাইটে আলাদাভাবে দেওয়া আছে, যা পরীক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
২. গুণ অনুসারে বচনের শ্রেণিবিভাগ
বচনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিধেয়কে স্বীকার বা অস্বীকার করা হচ্ছে কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে বচন দুই প্রকার:
ক) সদর্থক বা ইতিবাচক বচন (Affirmative Proposition)
যে বচনে বিধেয় পদটি উদ্দেশ্য পদ সম্পর্কে কোনো কিছু স্বীকার করে নেয়। সাধারণত এই বচনে সংযোজকটি 'হয়' (positive) থাকে।
উদাহরণ: মানুষ হয় মরণশীল।
খ) নঞর্থক বা নেতিবাচক বচন (Negative Proposition)
যে বচনে বিধেয় পদটি উদ্দেশ্য পদ সম্পর্কে কোনো কিছু অস্বীকার করে। এখানে সংযোজকটি 'নয়' (negative) থাকে।
উদাহরণ: কোনো মানুষ নয় অমর।
৩. পরিমাণ অনুসারে বচনের শ্রেণিবিভাগ
বচনের উদ্দেশ্য পদের ব্যাপ্তি বা পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বচনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) সার্বিক বা সামান্য বচন (Universal Proposition)
যে বচনে বিধেয়টি সমগ্র উদ্দেশ্য পদ সম্পর্কে স্বীকার বা অস্বীকার করা হয়। অর্থাৎ, উদ্দেশ্যের সকল অংশকে বোঝায়।
চিহ্ন: সকল, সব, সমস্ত, কোনো (নঞর্থক অর্থে)।
উদাহরণ: সকল কাক হয় কালো। (এখানে পৃথিবীর সব কাক সম্পর্কে বলা হয়েছে)।
খ) বিশেষ বচন (Particular Proposition)
যে বচনে বিধেয়টি উদ্দেশ্য পদের অংশবিশেষ সম্পর্কে স্বীকার বা অস্বীকার করে। অর্থাৎ, অন্তত একটি বা কিছু অংশকে বোঝায়।
চিহ্ন: কোনো কোনো, কিছু কিছু, অধিকাংশ।
উদাহরণ: কোনো কোনো ছাত্র হয় মেধাবী। (সকল ছাত্র নয়, কিছু ছাত্রের কথা বলা হয়েছে)।
৪. গুণ ও পরিমাণ অনুসারে চতুবর্গ পরিকল্পনা (Fourfold Classification)
যুক্তিবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিবিভাগ হলো গুণ ও পরিমাণের যৌথ ভিত্তি। অ্যারিস্টটলীয় যুক্তিবিজ্ঞানে নিরপেক্ষ বচনকে এই ভিত্তিতে ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একে A, E, I, O বচন বলা হয়। পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পেতে এই অংশটি সবচেয়ে বেশি জরুরি।
নিচে একটি ছকের মাধ্যমে বিষয়টি সহজ করে বোঝানো হলো:
বচনের নাম গুণ ও পরিমাণ প্রতীক (Symbol) আকার (Form) উদাহরণ
সার্বিক সদর্থক সামান্য + সদর্থক A সকল S হয় P সকল মানুষ হয় মরণশীল।
সার্বিক নঞর্থক সামান্য + নঞর্থক E কোনো S নয় P কোনো মানুষ নয় পূর্ণ।
বিশেষ সদর্থক বিশেষ + সদর্থক I কোনো কোনো S হয় P কোনো কোনো ফুল হয় লাল।
বিশেষ নঞর্থক বিশেষ + নঞর্থক O কোনো কোনো S নয় P কোনো কোনো ছাত্র নয় মনোযোগী।
আসুন, প্রতিটি বচন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
১. A বচন (Universal Affirmative)
এটি এমন একটি বচন যা পরিমাণে সার্বিক এবং গুণে সদর্থক। অর্থাৎ, এটি সমগ্র উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিধেয়কে স্বীকার করে।
গঠন: সকল + উদ্দেশ্য + হয় + বিধেয়।
উদাহরণ: সকল বাঘ হয় হিংস্র প্রাণী।
২. E বচন (Universal Negative)
এটি পরিমাণে সার্বিক কিন্তু গুণে নঞর্থক। এটি সমগ্র উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিধেয়কে অস্বীকার করে।
গঠন: কোনো + উদ্দেশ্য + নয় + বিধেয়।
উদাহরণ: কোনো বৃত্ত নয় ত্রিভুজ।
৩. I বচন (Particular Affirmative)
এটি পরিমাণে বিশেষ এবং গুণে সদর্থক। উদ্দেশ্যের কিছু অংশ সম্পর্কে বিধেয়কে স্বীকার করা হয়।
গঠন: কোনো কোনো + উদ্দেশ্য + হয় + বিধেয়।
উদাহরণ: কোনো কোনো আম হয় মিষ্টি।
৪. O বচন (Particular Negative)
এটি পরিমাণে বিশেষ এবং গুণে নঞর্থক। উদ্দেশ্যের কিছু অংশ সম্পর্কে বিধেয়কে অস্বীকার করা হয়।
গঠন: কোনো কোনো + উদ্দেশ্য + নয় + বিধেয়।
উদাহরণ: কোনো কোনো মানুষ নয় সৎ।
বচনের এই রূপান্তর সম্পর্কে আরও জানতে এবং প্র্যাকটিস করতে Stanford Encyclopedia of Philosophy{target="_blank"} এর পেজটি ভিজিট করতে পারেন (ইংরেজি ভাষায়)।
বাক্য থেকে বচনে রূপান্তর করার সাধারণ নিয়ম
পরীক্ষায় প্রায়ই সাধারণ বাক্য দেওয়া থাকে যা লজিক্যাল ফর্মে (Logical Form - L.F.) বা বচনে রূপান্তর করতে হয়। ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে কিছু গোল্ডেন রুলস নিচে দেওয়া হলো:
A বচন চেনার উপায়: বাক্যে যদি 'সকল', 'সব', 'প্রত্যেক', 'যেকোনো' শব্দ থাকে এবং বাক্যটি যদি হ্যা-বাচক হয়, তবে তা A বচন হবে।
বাক্য: সব মানুষ মরণশীল। -> বচন (A): সকল মানুষ হয় মরণশীল।
E বচন চেনার উপায়: বাক্যে যদি 'কোনো...নয়', 'কখনোই নয়', 'যুগপৎ নয়' থাকে, তবে তা E বচন।
বাক্য: মানুষ কখনোই দেবতা হতে পারে না। -> বচন (E): কোনো মানুষ নয় দেবতা।
I বচন চেনার উপায়: বাক্যে 'কিছু', 'অধিকাংশ', 'প্রায়', 'অনেক' শব্দ থাকলে এবং বাক্যটি হ্যা-বাচক হলে I বচন হয়।
বাক্য: অনেক মানুষ সৎ। -> বচন (I): কোনো কোনো মানুষ হয় সৎ।
O বচন চেনার উপায়: উপরের শব্দগুলো (কিছু, অধিকাংশ ইত্যাদি) যদি না-বাচক বাক্যে থাকে, তবে তা O বচন হয়।
বাক্য: সব চকচক করলেই সোনা হয় না। -> বচন (O): কোনো কোনো চকচকে বস্তু নয় সোনা।
কেন বচনের শ্রেণিবিভাগ জানা জরুরি?
যুক্তিবিজ্ঞানের পরবর্তী অধ্যায়গুলো, যেমন—আবর্তন (Conversion), বিবর্তন (Obversion), এবং ন্যায় অনুমান (Syllogism) শিখতে হলে বচনের শ্রেণিবিভাগ জানা অপরিহার্য। আপনি যদি A, E, I, O বচন সঠিকভাবে নির্ণয় করতে না পারেন, তবে যুক্তির বৈধতা বিচার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দর্শনের জটিল বিষয়গুলো সহজভাবে বুঝতে আমাদের দর্শনের পরিভাষা ও ব্যাখ্যা বিভাগটি ঘুরে দেখতে পারেন।
উপসংহার
বচনের শ্রেণিবিভাগ যুক্তিবিজ্ঞানের মেরুদণ্ড। আজকের আলোচনায় আমরা দেখলাম যে, বচন কেবল একটি বাক্য নয়, এটি সত্য বা মিথ্যার ধারক। সম্বন্ধ, গুণ ও পরিমাণের ভিত্তিতে বচনের এই ভাগগুলো পরিষ্কারভাবে বুঝলে পরীক্ষায় লজিক অংশে পূর্ণ নম্বর (Full Marks) পাওয়া খুব সহজ হয়ে যায়। আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনার পড়াশোনায় সহায়ক হবে।
আপনার যদি এই বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে বা অন্য কোনো টপিক নিয়ে জানতে চান, তবে নিচে কমেন্ট করে জানান। আমরা দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
শিক্ষার্থীদের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ: আপনি কি বচনের পদের ব্যাপ্যতা (Distribution of Terms) সম্পর্কে জানতে চান? এটি বচনের শ্রেণিবিভাগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কমেন্ট বক্সে "Yes" লিখুন, আমরা শীঘ্রই সেই বিষয়ে বিস্তারিত নোট নিয়ে আসব।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. বাক্য ও বচনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী? উত্তর: বাক্য হলো মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম যা আদেশ, অনুরোধ বা প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু বচন কেবল সেই বাক্য যা সত্য বা মিথ্যা হতে পারে (বিবৃতিমূলক বাক্য)।
২. গুণ ও পরিমাণ অনুসারে বচন কত প্রকার? উত্তর: গুণ ও পরিমাণ অনুসারে বচন ৪ প্রকার: A, E, I এবং O বচন।
৩. 'সব মানুষ সৎ নয়'—এটি কোন বচন? উত্তর: এটি O বচন। এর যুক্তিবিজ্ঞানসম্মত রূপ হবে: "কোনো কোনো মানুষ নয় সৎ।"
নোট: এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মৌলিক এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে।

