আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভারত: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বিদেশনীতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভারত (International Relations and India) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চর্চিত বিষয়। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত আর কেবল একটি 'উন্নয়নশীল দেশ' নয়, বরং একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি বা 'Global Power' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা International Relations (IR) হলো এমন একটি শাস্ত্র যা বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
ভারতের বিদেশনীতি বা পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো শান্তি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। প্রাচীন ভারতীয় দর্শন 'বসুধৈব কুটুম্বকম' (সমগ্র বিশ্বই এক পরিবার) আজও ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলমন্ত্র। এই আর্টিকেলে আমরা ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিদেশনীতির নির্ধারক এবং বিভিন্ন দেশের সাথে ভারতের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
সহজ কথায়, একটি দেশ যখন অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে কিংবা কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন তাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অংশ বলা হয়।
অধ্যাপক হ্যান্স জে. মরগেনথাউ (Hans J. Morgenthau)-এর মতে, "আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো ক্ষমতার লড়াই।" ভারতের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি মাধ্যম। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি মনে রাখা জরুরি যে, কোনো দেশই একা চলতে পারে না, তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বিদেশনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি কিছু নির্দিষ্ট নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই নীতিগুলোর বিবর্তন ঘটেছে।
১. জোটনিরপেক্ষ নীতি (Non-Alignment Policy)
স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) সময় যখন বিশ্ব আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, তখন ভারত কোনো পক্ষেই যোগ না দিয়ে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি জওহরলাল নেহেরুর মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল। যদিও বর্তমানে ভারত 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বা Strategic Autonomy-তে বিশ্বাসী, তবুও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা হিসেবে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম।
২. পঞ্চশীল নীতি (Panchsheel Principles)
১৯৫৪ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাইলফলক। এর পাঁচটি মূল কথা হলো:
একে অপরের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।
অনাক্রমণ বা আক্রমণ না করা।
একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
পারস্পরিক সুবিধা ও সমতা।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
৩. পূর্বে তাকাও এবং পূর্বে কাজ করো নীতি (Look East to Act East Policy)
১৯৯১ সালে নরসিমা রাও সরকার 'Look East Policy' চালু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এটিকে 'Act East Policy'-তে রূপান্তর করেন, যার মাধ্যমে আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভারতের সংবিধান ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন (Internal Link Placeholder)
বিশ্বশক্তির সাথে ভারতের সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান বুঝতে হলে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ভারত ও আমেরিকা সম্পর্ক (India-USA Relations)
বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অংশীদার হলো আমেরিকা।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি: দুই দেশের মধ্যে iCET (Initiative on Critical and Emerging Technology) চুক্তি হয়েছে, যা মহাকাশ গবেষণা ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে সাহায্য করবে।
বাণিজ্য: আমেরিকা বর্তমানে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার (Trading Partner)।
প্রবাসীদের ভূমিকা: আমেরিকায় বসবাসরত বিশাল ভারতীয় জনগোষ্ঠী দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে, রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক এবং মানবাধিকার ইস্যুতে মাঝে মাঝে দুই দেশের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। বিস্তারিত জানতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের রিপোর্ট দেখতে পারেন।
ভারত ও রাশিয়া সম্পর্ক (India-Russia Relations)
রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু।
প্রতিরক্ষা: ভারতের সামরিক বাহিনীর প্রায় ৬০-৭০% সরঞ্জাম আজও রাশিয়ান প্রযুক্তির। এস-৪০০ (S-400) মিসাইল সিস্টেম এর বড় উদাহরণ।
শক্তি নিরাপত্তা: ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর ইস্যুতে রাশিয়া সবসময় ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে।
ভারত ও চীন সম্পর্ক (India-China Relations)
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চীন।
সীমান্ত সমস্যা: ১৯৬২ সালের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ (২০২০) দুই দেশের সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে গেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি: চীনের সাথে ভারতের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit) রয়েছে, যা ভারতের অর্থনীতির জন্য চিন্তার বিষয়।
ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য রুখতে ভারত QUAD (ভারত, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া)-এর মতো জোটে সক্রিয় হয়েছে।
প্রতিবেশী প্রথম নীতি (Neighborhood First Policy)
ভারত মনে করে, নিজের উন্নয়ন করতে হলে প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি। একেই বলা হয় 'নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি'।
১. ভারত ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ভারতের নিকটতম বন্ধু।
সংযোগ বা কানেক্টিভিটি: রেল, সড়ক এবং নৌপথে দুই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে।
বাণিজ্য: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ।
নিরাপত্তা: উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
২. ভারত ও পাকিস্তান
সন্ত্রাসবাদ এবং কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই উত্তেজনাপূর্ণ। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, "সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না।" বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রায় স্থগিত।
৩. অন্যান্য প্রতিবেশী
নেপাল ও ভুটান: এদের সাথে ভারতের উন্মুক্ত সীমান্ত ও গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারত বড় বিনিয়োগকারী।
শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময় ভারত প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা 'প্রতিবেশী প্রথম' নীতির সেরা উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক সংগঠন ও ভারত (India in Global Organizations)
ভারত এখন আর শুধু দর্শক নয়, বরং নিয়ম-নির্ধারক (Rule Maker) হতে চায়।
G20 প্রেসিডেন্সি: ২০২৩ সালে ভারত সফলভাবে G20 সম্মেলন আয়োজন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত 'গ্লোবাল সাউথ' বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ (UN): ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) স্থায়ী সদস্য পদের জন্য দীর্ঘকাল ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমানে ভারত জি-৪ (G4) গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে এই দাবি জোরালো করছে।
ব্রিকস (BRICS): ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার এই জোটে ভারত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে পশ্চিমী দুনিয়ার একাধিপত্যের ভারসাম্য বজায় রাখছে।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পথে কিছু বাধা বা চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ: পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদের হুমকি।
চীনের আগ্রাসন: সীমান্তে এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমাগত উপস্থিতি।
শক্তি নিরাপত্তা: তেল ও গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
জলবায়ু পরিবর্তন: উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে কার্বন নির্গমন কমানোর আন্তর্জাতিক চাপ।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভারত বিষয়টি অত্যন্ত গতিশীল। ভারত বর্তমানে তার 'Strategic Autonomy' বজায় রেখে বিশ্বের প্রতিটি ব্লকের সাথে (আমেরিকা ও রাশিয়া—উভয়ের সাথে) ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। ভারতের লক্ষ্য হলো একটি বহু-মেরু (Multi-polar) বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে কোনো একটি দেশের দাদাগিরি থাকবে না। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বিষয়টি বোঝা জরুরি কারণ আগামী দিনে ভারত বিশ্ব রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা পালন করতে চলেছে।
ভারতের এই উত্থান কেবল তার নিজের জন্য নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা।
আপনার মতামত দিন (Call to Action)
আপনি কি মনে করেন ভারতের রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হওয়া উচিত? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান। আর্টিকেলটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ভারতের বিদেশনীতির জনক কাকে বলা হয়? জওহরলাল নেহেরুকে ভারতের বিদেশনীতির স্থপতি বা জনক বলা হয়।
২. পঞ্চশীল নীতি কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল? ১৯৫৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর মধ্যে পঞ্চশীল নীতি স্বাক্ষরিত হয়।
৩. 'লুক ইস্ট পলিসি' কবে চালু হয়? ১৯৯১ সালে নরসিমা রাও সরকারের আমলে 'লুক ইস্ট পলিসি' চালু হয়।
৪. বর্তমানে ভারতের বিদেশমন্ত্রী কে? বর্তমানে (২০২৪-২৫ প্রেক্ষাপটে) ভারতের বিদেশমন্ত্রী হলেন ড. এস. জয়শঙ্কর।
দাবিত্যাগ: এই আর্টিকেলের তথ্যগুলো বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার্য।

