ভারতে জননীতি বিশ্লেষণ (Public Policy Analysis in India) - সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট।

Best Online Education
By -
0

 

ভারতে জননীতি বিশ্লেষণ: ধারণা, প্রক্রিয়া, গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ - একটি বিস্তারিত আলোচনা

ভারতে-জননীতি-বিশ্লেষণ


(Public Policy Analysis in India: A Comprehensive Guide)

ভারতে জননীতি বিশ্লেষণ (Public Policy Analysis in India) - সংজ্ঞা, গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট।

ভারতে জননীতি বিশ্লেষণ বা Public Policy Analysis সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। এর সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া, নীতি আয়োগের ভূমিকা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো। ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নোট।

ভূমিকা (Introduction)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এবং লোকপ্রশাসনে 'জননীতি' বা 'Public Policy' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল দেশে, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সরকার কী করবে, কেন করবে এবং কীভাবে করবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার নামই হলো জননীতি বিশ্লেষণ।

একজন ছাত্র বা সচেতন নাগরিক হিসেবে ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বুঝতে হলে পাবলিক পলিসি অ্যানালাইসিস বোঝা অপরিহার্য। এই আর্টিকেলে আমরা ভারতের প্রেক্ষাপটে জননীতি বিশ্লেষণের প্রতিটি দিক নিয়ে সহজ সরল ভাষায় আলোচনা করব, যা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে এবং বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করবে।

জননীতি বা পাবলিক পলিসি কী? (What is Public Policy?)

সহজ কথায়, জননীতি হলো সরকারের গৃহীত সেই সব কার্যক্রম বা সিদ্ধান্ত, যা জনগণের সমস্যার সমাধান এবং দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া হয়। এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

উদাহরণস্বরূপ, ভারতে শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য সরকার যখন 'সর্বশিক্ষা অভিযান' বা সাম্প্রতিক 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০' (NEP 2020) গ্রহণ করে, তখন সেগুলোকে জননীতি বলা হয়।

জননীতি বিশ্লেষণের মূল উপাদানগুলো হলো: ১. লক্ষ্য: কী অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে? ২. পদ্ধতি: কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করা হবে? ৩. প্রভাব: এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে?

ভারতে জননীতি বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা (Importance of Policy Analysis in India)

ভারতের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে জননীতি বিশ্লেষণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:

১. সীমিত সম্পদ ও অসীম চাহিদা

ভারতের জনসংখ্যা বিশাল, কিন্তু সম্পদ সীমিত। তাই কোন খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা) কতটা অর্থ বরাদ্দ করা উচিত, তা নির্ধারণ করতে সঠিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন।

২. আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ

ভারতে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান অনেক বেশি। জননীতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকার এমন নীতি তৈরি করার চেষ্টা করে যাতে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ (SC, ST, OBC, এবং দরিদ্র শ্রেণি) মূল স্রোতে ফিরতে পারে।

৩. গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা

গণতন্ত্রে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কোনো নীতি ব্যর্থ হলে কেন ব্যর্থ হলো, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকার ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে পারে।

৪. টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)

পরিবেশ রক্ষা করে কীভাবে শিল্পোন্নত দেশ হওয়া যায়, তার জন্য সঠিক পলিসি বা নীতির প্রয়োজন।

জননীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া বা চক্র (The Public Policy Cycle in India)

ভারতে একটি নীতি তৈরি হতে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। একে 'পলিসি সাইকেল' বা নীতি চক্র বলা হয়। ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সমস্যা চিহ্নিতকরণ (Agenda Setting)

প্রথমে সরকার বা নীতিনির্ধারকরা সমাজের একটি নির্দিষ্ট সমস্যাকে চিহ্নিত করেন। যেমন—কৃষকদের আয় কম হওয়া বা বেকারত্ব। মিডিয়া, সিভিল সোসাইটি এবং রাজনৈতিক দলগুলো এই সমস্যাগুলো সামনে আনতে সাহায্য করে।

২. নীতি গঠন (Policy Formulation)

সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর, সেটি সমাধানের জন্য খসড়া তৈরি করা হয়। এই ধাপে আমলা (Bureaucrats), বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং বর্তমানে 'নীতি আয়োগ' (NITI Aayog) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়।

৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Policy Adoption)

খসড়া নীতিটি মন্ত্রিপরিষদ বা সংসদে পেশ করা হয়। সেখানে আলোচনার পর ভোটাভুটির মাধ্যমে এটি পাশ হলে তা সরকারি নীতি বা আইনে পরিণত হয়।

৪. নীতি বাস্তবায়ন (Policy Implementation)

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আইন বা নীতি পাশ হওয়ার পর তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করার দায়িত্ব বর্তায় আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনের ওপর (যেমন—IAS, IPS অফিসার এবং স্থানীয় প্রশাসন)।

৫. মূল্যায়ন (Policy Evaluation)

নীতিটি কার্যকর করার পর দেখা হয় এটি কতটা সফল হয়েছে। যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া যায়, তবে নীতিতে পরিবর্তন আনা হয় বা বাতিল করা হয়।

ভারতে জননীতি প্রণয়নে প্রধান সংস্থাসমূহ (Key Institutions in Policy Making)

ভারতে পলিসি তৈরিতে একক কোনো ব্যক্তি নয়, বরং একাধিক সংস্থা কাজ করে।

১. সংসদ (Legislature)

ভারতের সংসদ (লোকসভা ও রাজ্যসভা) হলো সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। এখানে জননীতি নিয়ে বিতর্ক হয় এবং চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

২. কার্যনির্বাহী বিভাগ (Executive)

প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিপরিষদ মূল নীতিনির্ধারক। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO) বর্তমান সময়ে নীতি প্রণয়নে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

৩. আমলাতন্ত্র (Bureaucracy)

এরা হলো ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। রাজনীতিবিদরা নীতি তৈরি করেন, কিন্তু তথ্যের যোগান দেওয়া এবং সেই নীতি বাস্তবায়ন করার কাজ আমলাদের।

৪. নীতি আয়োগ (NITI Aayog)

২০১৫ সালে পরিকল্পনা কমিশনের পরিবর্তে 'নীতি আয়োগ' (National Institution for Transforming India) গঠন করা হয়। এটি ভারতের প্রধান 'থিংক ট্যাঙ্ক' (Think Tank) হিসেবে কাজ করে। এটি রাজ্য সরকারগুলোকে নীতি তৈরিতে পরামর্শ দেয় এবং 'বটম-আপ' (Bottom-up) এপ্রোচ বা নিচ থেকে ওপরের দিকে নীতি নির্ধারণে বিশ্বাসী।

৫. বিচার বিভাগ (Judiciary)

সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টগুলো দেখে যে কোনো নীতি সংবিধান বিরোধী কি না। যেমন—তিন তালাক রদ বা আধার কার্ডের গোপনীয়তা সংক্রান্ত রায় জননীতিকে প্রভাবিত করেছে।

ভারতে জননীতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ (Challenges in Policy Implementation)

খাতায়-কলমে ভারতের নীতিগুলো বিশ্বের অন্যতম সেরা, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘাটতি দেখা যায়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  • দুর্নীতি (Corruption): নিচুতলায় দুর্নীতির কারণে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা অনেক সময় প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না।

  • সমন্বয়ের অভাব: কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে অনেক ভালো নীতি আটকে থাকে।

  • তথ্যের অভাব (Lack of Data): সঠিক এবং আপ-টু-ডেট তথ্যের অভাবে অনেক সময় ভুল নীতি গ্রহণ করা হয়।

  • আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা (Red Tapism): ফাইলের জটে আটকে পড়ে অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ দেরি হয়।

  • জনসচেতনতার অভাব: অনেক সময় সাধারণ মানুষ জানেই না যে তাদের জন্য সরকার কী কী স্কিম চালু করেছে।

সাম্প্রতিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ জননীতির উদাহরণ (Case Studies of Recent Policies)

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়া খুব জরুরি। নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. জিএসটি (GST - Goods and Services Tax)

এটি ভারতের কর ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কার। 'এক দেশ, এক কর' নীতির মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করা এবং সরকারের রাজস্ব বাড়ানোই ছিল এর লক্ষ্য। শুরুতে কিছু সমস্যা হলেও এটি ভারতীয় অর্থনীতিকে সুসংহত করেছে।

২. আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat)

এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ সরকারি স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প। এর লক্ষ্য হলো দরিদ্র পরিবারগুলোকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া। এটি জনস্বাস্থ্য নীতিতে একটি বিপ্লব।

৩. ডিজিটাল ইন্ডিয়া (Digital India)

সরকারি পরিষেবাগুলোকে অনলাইনে নিয়ে আসা এবং ইন্টারনেটের প্রসার ঘটানোই এর লক্ষ্য। এর ফলে ডিবিটি (Direct Benefit Transfer) বা সরাসরি ভর্তুকি প্রদান সহজ হয়েছে এবং দুর্নীতি কমেছে।

৪. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)

৩৪ বছর পর ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতা-ভিত্তিক (Skill-based) শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

জননীতি বিশ্লেষণে আধুনিক প্রবণতা (Modern Trends in Policy Analysis)

বর্তমানে ভারতে পলিসি অ্যানালাইসিসের ধরণ পাল্টাচ্ছে:

  • তথ্য-ভিত্তিক নীতি (Evidence-based Policy): এখন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ডেটা বা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি তৈরি হচ্ছে।

  • প্রযুক্তির ব্যবহার: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং বিগ ডেটা (Big Data) ব্যবহার করে সরকার বুঝতে চেষ্টা করছে মানুষের চাহিদা কী।

  • জনগণের অংশগ্রহণ: 'MyGov' এর মতো পোর্টালের মাধ্যমে সরকার নীতি তৈরির আগে সাধারণ মানুষের মতামত নিচ্ছে।

উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, পাবলিক পলিসি অ্যানালাইসিস বা জননীতি বিশ্লেষণ কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চাবিকাঠি। ভারত যত উন্নত হচ্ছে, জননীতির জটিলতাও তত বাড়ছে। একটি সফল জননীতি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায় না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।

ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বিষয়টি অধ্যয়ন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (যেমন UPSC বা WBCS অফিসার) হিসেবে কাজ করতে হলে এই জ্ঞানটিই তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। নীতি আয়োগের সক্রিয়তা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতের জননীতি প্রণয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা আগামী দিনে ভারতকে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী করবে।

FAQs (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী):

প্রশ্ন: নীতি আয়োগ কবে গঠিত হয়? 

উত্তর: ১লা জানুয়ারি, ২০১৫ সালে।

প্রশ্ন: ভারতের জননীতির প্রধান সমস্যা কী? 

উত্তর: প্রধান সমস্যা হলো সঠিক বাস্তবায়ন বা Implementation Gap।

প্রশ্ন: জননীতি কয় প্রকার হতে পারে? 

উত্তর: মূলত তিন প্রকার—নিয়ন্ত্রণমূলক (Regulatory), বন্টনমূলক (Distributive), এবং পুনুবন্টনমূলক (Redistributive)।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default